শনিবার, মে ৩০, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত: সামনে কোন পথে যাবে পরিস্থিতি?

এপ্রিল ১৬, ২০২৬ ১২:১১ pm

পাকিস্তানের একটি প্রতিনিধি দল তেহরানে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি দেখে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা যুদ্ধবিরতি আলোচনা নিয়ে ভাবছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নিয়ে পাকিস্তানে গত রোববার ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় চলা আলোচনা কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হলেও দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি এখনও বহাল রয়েছে।

অমীমাংসিত সেই আলোচনার এক দিনের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ভাষ্যে ইরান নিয়ে নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি অবরোধের প্রস্তাব দেন।

প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারার এই ব্যর্থতাকে কীভাবে দেখা উচিত? পরবর্তী আলোচনার সম্ভাবনাই বা কতটা আছে? ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কি নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা বৃদ্ধির দিকে এগোচ্ছে, নাকি অবশ্যম্ভাবীভাবে বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে দেশ দুইটি?

পরবর্তী সময়ে কী ঘটতে পারে, তার চারটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট দেখা যাচ্ছে।

১. ‘কৌশলগত বিরতি’ হিসেবে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরত

কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা লড়াইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতিকে সংকট নিয়ন্ত্রণে রাখার স্বদিচ্ছা বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল। তবে শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে অস্পষ্টতা ছিল।

ভৌগোলিক পরিসর, কোন ধরনের লক্ষ্যবস্তু যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়বে, এমনকি ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন’ কী–এসব শর্তের ব্যাখ্যা নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে পর্যবেক্ষকদের কাছে এই সমঝোতাকে টেকসই কাঠামোর বদলে একটি কৌশলগত বিরতি হিসেবে মনে হয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজ-এর সিনিয়র ফেলো বেহনাম বেন তালেবলু বলেন, ‘সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি ছিল।’

তিনি বলেন, ‘এগুলো এমন একগুচ্ছ নীতি, অবস্থান ও নীতিমালা-যেগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র বহু বছর ধরে দ্বিমত পোষণ করে আসছে। আর স্বল্পমেয়াদে এই যুদ্ধ সেই পার্থক্য কমাতে ব্যর্থ তো হয়েছেই, বরং তা আরও বাড়িয়েছে।’

তার মধ্যে দুই দেশের কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। ইরানের কর্মকর্তারা যেখানে বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের কথা বলছেন, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের প্রতিশ্রুতির একটি সীমিত ব্যাখ্যা তুলে ধরছে।

বর্ণনার এই ভিন্নতা কার্যত অবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে। একইসাথে যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়েও সন্দেহ তৈরি করেছে।

আলোচনার টেবিলে ফেরার প্রচেষ্টার কোনো ফলাফল না এলে এই যুদ্ধবিরতি সম্ভবত কেবল সময়ক্ষেপণের একটি মাধ্যম হয়ে থাকবে, যা দুই পক্ষকে আপাতভাবে একটু থামার; নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন, পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের এবং পরবর্তী পর্যায়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ দেবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর, ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল ইরানের তেহরানের রেভোলিউশন স্কোয়ারে জাতীয় পতাকা হাতে সমবেত হন ইরানিরা। তার ওপর কোনো এক পক্ষ যদি মনে করে যে বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জন্য যথেষ্ট লাভজনক নয় এবং চাপ বাড়ানো প্রয়োজন, তাহলে এই ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র তখন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যেমন-বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু বা জ্বালানির মতো স্থাপনাকে টার্গেট করাকে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।

এ ধরনের হামলা স্বল্পমেয়াদে উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করতে পারলেও তা ব্যাপক মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে এবং ইরানের পক্ষ থেকে আরও শক্ত প্রতিক্রিয়া উসকে দিতে পারে।

একইসাথে, আলোচনার বিষয়ে খুবই সংশয়ী অবস্থানে থাকা ইসরায়েল প্রভাবশালী ভূমিকায় আবির্ভূত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, ‘ইসরায়েল আলোচনায় যুক্ত ব্যক্তিসহ ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের হত্যার মতো পদক্ষেপ নিতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও হরমুজ প্রণালি অবরোধের বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত নীতি সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।’

উত্তেজনা বৃদ্ধির সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া না গেলেও বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত শুরু হলে যে পরিমাণে খরচ হবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হবে, সেটা বিবেচনায় নেওয়া হলে নিকটবর্তী সময়ে এমনটা ঘটার সম্ভাবনা কমে আসতে পারে।

২. ‘ছায়া যুদ্ধ’

সবচেয়ে বেশি সম্ভাব্য দৃশ্যপটগুলোর একটি হলো এমন এক ধরনের মুখোমুখি অবস্থানে ফিরে যাওয়া যাকে ‘নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে।

এর অর্থ হলো, সংঘাত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে পৌঁছাবে না, আবার সামরিক পদক্ষেপ থেকেও দুই পক্ষ পুরোপুরি বিরত থাকবে না। এতে করে অবকাঠামো, সামরিক লক্ষ্যবস্তু এমনকি সরবরাহ লাইনের ওপর সীমিত আকারে হামলা অব্যাহত থাকতে পারে।

এক্ষেত্রে প্রক্সি শক্তিগুলোর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ইরাক বা লোহিত সাগরে তৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এসব নেটওয়ার্কের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি চাপ মিলিয়ে সরাসরি যুদ্ধের তীব্রতা না বাড়লেও সংঘাতের ভৌগোলিক বিস্তার বাড়তে পারে। বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে বর্ণনা করছেন ‘ছায়া যুদ্ধ’ হিসেবে।

হামিদরেজা আজিজি বলেন, ‘দুই পক্ষই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে না জড়িয়ে একে অপরকে প্রভাবিত করতে নিজেদের বিকল্প ও চাপ প্রয়োগের উপায়গুলো ব্যবহার করতে চায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘিত হয়, তাহলে ইরান তার মিত্র বাহিনীর মাধ্যমে—বিশেষ করে ইয়েমেনে—নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’

তবে এই দৃশ্যপটও ঝুঁকিমুক্ত নয়। উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুল হিসাবের ঝুঁকিও বাড়ে, এবং কোনো পক্ষই ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা না বাড়ালেও একটি ভুল সিদ্ধান্ত সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।

৩. নীরব কূটনীতি অব্যাহত থাকা

পাকিস্তানে আলোচনা ব্যর্থ হলেও এখনই এ কথা বলা সম্ভব নয় যে কূটনৈতিক সমঝোতা বা আলোচনার সুযোগ শেষ হয়ে গেছে। এই আলোচনার আয়োজক হিসেবে পাকিস্তান আগামী দিনগুলোতে তেহরান ও ওয়াশিংটনকে বার্তা আদান–প্রদানের মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে উৎসাহিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একই সময়ে, কাতার, ওমান এমনকি সৌদি আরব ও মিশরের মতো ঐতিহ্যগত মধ্যস্থতাকারীরাও সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উদ্বেগ থেকে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে এবং সংকটের আকস্মিক উত্তেজনা বৃদ্ধিকে প্রতিরোধের চেষ্টা করতে পারে।

তবে মূল বিষয় হলো, দুই পক্ষের মধ্যকার মৌলিক ব্যবধান কমানোর ওপর অগ্রগতি নির্ভর করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাব এবং ইরানের ১০ দফা পাল্টা প্রস্তাব থেকে বোঝা যায় যে মধ্যপন্থার বদলে নিজেদের কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়ে দুই দেশই অনড় অবস্থানে রয়েছে।

সুতরাং, নতুন করে আলোচনা সম্ভব হলেও স্বল্পমেয়াদে দ্রুত ও বিস্তৃত কোনো চুক্তির আশা করা এখনো বাস্তবসম্মত নয়।

৪. দীর্ঘস্থায়ী নৌ অবরোধ

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সামুদ্রিক অবরোধ আরোপের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যার ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল করতে পারবে না।

প্রণালি পারাপারের জন্য ইরানকে ট্রানজিট ফি দেওয়া যেকোনো জাহাজকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় আটকানোর হুমকিও দিয়েছেন তিনি।

ইরানের তেল আয়ের উৎস বন্ধ করে দেশটির অর্থনীতিকে সংকুচিত করার পাশাপাশি ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা ও যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে আঘাত করাকেই এই কৌশলের লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।

ইরানের দীর্ঘ উপকূলরেখার কথা উল্লেখ করে বেহনাম বিন তালেবলু বলেন বলেন, ‘পর্যাপ্ত গোয়েন্দা, নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ (আইএসআর) ব্যবস্থা বরাদ্দ করা হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বন্দরগুলোর ওপর সামুদ্রিক অবরোধ অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘এই ধরনের পদক্ষেপের বাস্তব ফল হবে সরকারকে তার প্রধান পণ্য রপ্তানি করার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করা।’

তবে অন্য বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ ধরনের নীতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উল্লেখযোগ্য ব্যয় বৃদ্ধি করতে পারে, কারণ এতে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের আরও কাছাকাছি চলে আসবে এবং হামলার ঝুঁকিতে পড়বে। তাছাড়া, পরিকল্পনাটি কার্যকর করতে হলে নৌবাহিনীকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ইরানের সীমান্তের কাছে মোতায়েন রাখতে হবে, যার ফলে বিপুল ব্যয় হবে।

এ ধরনের নীতি বজায় রাখা হলে তা বৈশ্বিক তেল ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, পাশাপাশি হুথিদের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে বিঘ্ন সৃষ্টি করার সম্ভাবনাও বাড়াবে, যা তেলের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

আঞ্চলিক কাঠামোগত অস্থিতিশীলতা- অঞ্চলের নতুন বাস্তবতা?

সবশেষে এই দৃশ্যপটগুলো থেকে যা স্পষ্ট হয় তা হলো, এই অঞ্চল এমন একপর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে যুদ্ধ ও শান্তির সীমারেখা আগের চেয়ে অনেক বেশি অস্পষ্ট।

পাকিস্তানে আলোচনা ব্যর্থ হওয়া যেমন কূটনীতির সমাপ্তি না, আবার তা বৃহত্তর যুদ্ধের চূড়ান্ত সূচনাও না। বরং এটি ‘গ্রে-জোন’ বা অস্পষ্ট পরিস্থিতির অব্যাহত থাকার দিকেই ইঙ্গিত দেয়।

হামিদরেজা আজিজি বলেন, ‘যদিও উভয় পক্ষই এই সংঘাতের অবসান চায়, স্বল্পমেয়াদে তা সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না।’

বর্তমান পরিবেশে কৌশলগত সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রশ্ন এবং মাঠপর্যায়ের ছোটখাটো ঘটনাও সংকটের সামগ্রিক গতিপথে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

এর ফলে অনেক বিশ্লেষক এই অঞ্চলে ‘কাঠামোগত অস্থিতিশীলতা’র কথা বলতে শুরু করেছেন। এটি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে খেলার নিয়মকানুন পুরোপুরি সংজ্ঞায়িত নয়, আর ফলাফলও অনিশ্চিত।

এই পরিস্থিতিতে, সম্ভবত সবচেয়ে সঠিক ব্যাখ্যা হলো, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে যেখানে যুদ্ধ এবং আলোচনা একইসাথে চলছে। দুই পক্ষই সামরিক সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করে চলেছে, পাশাপাশি কূটনৈতিক পথও আংশিকভাবে খোলা রাখছে।