সোমবার, মার্চ ২, ২০২৬

চিকেনস নেক-এ মাটির নিচে কেন রেলপথ বানাচ্ছে ভারত?

ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬ ৭:৩৮ pm

চিকেনস নেক বা শিলিগুড়ি করিডরে মাটির নিচে সুড়ঙ্গ কেটে রেললাইন বসানোর পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত করেছে ভারত। অন্যদিকে আসামে, ব্রহ্মপুত্র নদের নিচ দিয়েও সুদীর্ঘ এক সুড়ঙ্গপথের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে ভারত সরকার।ভারত হঠাৎ করে কেন চিকেনস নেক-এ মাটির নিচ দিয়ে রেলসুড়ঙ্গ বানাতে চাইছে? আর আসামে ব্রহ্মপুত্র নদের তলদেশে রেল–সড়ক সুড়ঙ্গের প্রয়োজনই-বা কী?

সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য একসঙ্গে দেখলে এটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভৌগোলিক রাজনীতি, নিরাপত্তার হিসাব এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা।

চিকেনস নেক কী?

চিকেনস নেক বা শিলিগুড়ি করিডর হলো ভারতের সেই সংকীর্ণ ভূখণ্ড, যা ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করে রেখেছে। চিকেনস নেক-এর সবচেয়ে সরু অংশে ভারতের ভূখণ্ড গড়ে মাত্র ২০–২২ কিলোমিটার। এর এক পাশে বাংলাদেশ, অন্য পাশে নেপাল, উত্তরে ভুটান ও চীনের সীমান্ত।

এই করিডরকে ভারতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সংযোগপথ বলা হয়। কারণ, উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে সড়ক, রেল, জ্বালানি পাইপলাইন, বিদ্যুৎ লাইন, ইন্টারনেট কেবল — সবই এই সরু অংশ দিয়ে গেছে। সহজভাবে বললে, এই করিডরে বড় ধরনের ব্যাঘাত মানে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে ভারতের স্থল যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা।

চিকেনস নেক-এ কী বানাতে যাচ্ছে ভারত?

ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তিনমাইল হাট থেকে রাঙাপানি হয়ে বাগডোগরা পর্যন্ত প্রায় ৩৫–৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ রেললাইন পরিকল্পনা করেছে ভারত। এতে থাকবে দুটি সমান্তরাল সুড়ঙ্গ।

রেল কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই রুটকে এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে এতে যোগাযোগ থাকে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন, বাইরের ঝুঁকিতে রেল চলাচল সহজে ব্যাহত না হয় এবং প্রতিরক্ষা ও জরুরি পরিবহনের ক্ষেত্রে সুবিধা পায় ভারত। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যাত্রী পরিবহন করা হলেও ভূগর্ভস্থ এই নতুন রেললাইনের সামরিক গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি।

উত্তর পূর্ব রেলওয়ের মুখপাত্র কপিঞ্জল কিশোর শর্মা বলছেন, ‘প্রকল্পটি প্রস্তুত করা হয়েছে, তবে চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো আসেনি।’ তবে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব ভারতের কেন্দ্রীয় বাজেটের পরে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এই প্রকল্পটির বিষয়ে প্রথম জানিয়েছিলেন। তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে এই প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা।

প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই রেলসুড়ঙ্গ নির্মাণে সুড়ঙ্গ কাটার যন্ত্রের মাধ্যমে সুড়ঙ্গ নির্মাণ করা হবে। এতে উন্নত বিদ্যুতায়ন ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় সংকেত ব্যবস্থা ও অপটিক ফাইবারভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকবে। ভারী এক্সেল লোড সহনশীল কাঠামো হবে রেলসুড়ঙ্গের বৈশিষ্ট্য। এগুলো মূলত দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত হবে।

কেন মাটির নিচে?

এর ব্যাখ্যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তবে সম্ভবত এটি সহজেই বোঝা যায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য থেকে কয়েকটি পয়েন্ট পাওয়া যাচ্ছে –

  • ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা: চিকেনস নেক একটি জনবহুল এলাকা, যেখানে অনেক অবকাঠামো আছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নতুন করে মাটির ওপর বড় রেলপথ বসানো বাস্তবে কঠিন, কারণ এখানে জায়গা সীমিত এবং এখানে এরই মধ্যে বহু লাইন, পাইপলাইন ও কেবল আছে। পরিবেশ ও স্থানীয় লোকজনের বসতির হিসাব তো আছেই! এদিক থেকে ভূগর্ভস্থ রুট এই চাপ কমায়।
  • নিরাপত্তা ও সামরিক হিসাব: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সম্ভবত এটিই। সংবাদমাধ্যমগুলোর আলোচনায়ও সবচেয়ে জোরালোভাবে এই যুক্তিই উঠে এসেছে। মূল ধারণাটি হলো— মাটির ওপরের অবকাঠামো সহজেই প্রতিপক্ষের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগেও ঝুঁকি থাকে। সে তুলনায় ভূগর্ভস্থ করিডরকে বাইরে থেকে শনাক্ত করা এবং এর ক্ষতিসাধন করা প্রতিপক্ষের জন্য তুলনামূলক কঠিন হওয়ার কথা।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার প্রবীর সান্যাল বিবিসি বাংলায় বলছিলেন, ‘ওই অঞ্চলে মাটির নিচে সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে সেনা সদস্যদের আর সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের সুবিধাটা হবে, যে কোনো ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষিপ্ত হলেও এই উত্তর পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না শত্রু দেশ – এতটাই মোটা কংক্রিট দিয়ে বানানো হবে সুড়ঙ্গ’ – বলছিলেন ব্রিগেডিয়ার সান্যাল।

কৌশলগত বিষয়ের বিশ্লেষক প্রতীম রঞ্জন বসু বিবিসি বাংলায় বলেছেন, ‘এখন ভারত যখনই কোনো অবকাঠামোগত পরিকল্পনা করছে, সেসময়ে মাথায় রাখা হচ্ছে সামরিক পরিবহনের কথা। যত টানেল হচ্ছে ভারতে, সব ক্ষেত্রেই এমনভাবে পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে যাতে সৈন্য বাহিনী অন্তত ৩০ দিন ওই সব সুড়ঙ্গে ভেতরে অবস্থান করতে পারে, আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।’

‘…ভূগর্ভস্থ রেলপথ গড়া হলে তা এতটাই সুরক্ষিত থাকবে, মোটা কংক্রিট দিয়ে ঢালাই করা হবে যে মাটির ওপরে কোনো ধরনের বাধা তৈরি বা আক্রমণ হলেও মাটির নিচে নিরবচ্ছিন্নভাবে যাতায়াত চালু থাকবে। যাত্রী পরিবহনকারী ট্রেন চললেও চিকেনস নেক করিডোর সামরিক দিক থেকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ’ – বলছিলেন প্রতীম রঞ্জন বসু।

চিকেনস নেক-এ ভারতের সেনাঘাঁটি ও নৌঘাঁটির সঙ্গে সম্পর্ক

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে লেখা, ঘটনাচক্রে ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি যে তিনটি নতুন সেনা ঘাঁটি বানাচ্ছে, তার মধ্যে দুটি – বিহারের কিশানগঞ্জ এবং পশ্চিমবঙ্গের চোপড়ার খুব কাছাকাছি দিয়েই যাবে প্রস্তাবিত ভূগর্ভস্থ রেলপথটি। তৃতীয় সেনা ঘাঁটিটি হচ্ছে আসামের ধুবড়িতে।

এছাড়াও মাটির ওপর দিয়ে যে দুই লাইনের রেলপথ ইতিমধ্যেই আছে, সেটিকে চার লাইনের রেলপথে পরিবর্তিত করা হবে।

উত্তর পূর্ব রেলওয়ের মুখপাত্র কপিলঞ্জল কিশোর শর্মা বলছিলেন, ‘ভূগর্ভস্থ রেলপথটি এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে কৌশলগতভাবে স্পর্শকাতর শিলিগুড়ি করিডোর দিয়ে নিরাপদে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে যোগাযোগ রক্ষা করা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘নেপাল, ভুটান আর বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে এই করিডোরের খুব কাছে। আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নিরাপত্তা সংক্রান্ত বাধা বিপত্তিও থাকে, সেদিক থেকে মাটির নিচ দিয়ে এই রেলপথ অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সুরক্ষিত এবং অ-দৃশ্যমান এই পথ দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে সেনা, সামরিক সরঞ্জাম আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে ত্রাণ সামগ্রী পাঠানো যাবে। আবার এই রেললাইনের কাছেই বাগডোগরা বিমান ঘাঁটি ও ব্যাঙডুবিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩৩ কোরের সেনাছাউনি অবস্থিত, তাই রেল-বিমান সংযোগেও সহায়তা করবে এই রেলপথ।

ব্যয় কত হবে?

রেল কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি ভারতীয় রূপি। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর প্রকৃত অঙ্ক নির্ধারিত হবে।

এর বাইরে আসামে ব্রহ্মপুত্রের নিচে সুড়ঙ্গ কেন?

‘চিকেনস নেক’-এর প্রকল্পের পাশাপাশি আরেকটি বড় পরিকল্পনা সামনে এসেছে আসামে। সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র নদের নিচ দিয়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সমান্তরাল দুটি সুড়ঙ্গ নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে ভারত সরকার।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার, ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে এক বৈঠকে অর্থনৈতিক বিষয়সমূহের ক্যাবিনেট কমিটি একটি পরিকল্পনায় অনুমোদন দিয়েছে, যেটিতে আসামে ব্রহ্মপুত্র নদের নিচ দিয়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এমন একটি সুড়ঙ্গ পথ বানানো হবে, যেখানে ট্রেন আর গাড়ি দুই-ই চলাচল করতে পারবে।

কী থাকবে সেখানে?

একটি সুড়ঙ্গ দিয়ে ট্রেন চলবে, অন্যটি দিয়ে চার লেন সড়ক চলবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে গোহপুর ও নুমালিগড়ের মধ্যে ২৪০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে সময় কম লাগবে, বর্তমানে এই দূরত্ব অতিক্রম করতে সময় লাগে প্রায় ছয় ঘণ্টা।

কেন আসামের এই সুড়ঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ?

এতে যোগাযোগে সময় কমবে। বর্তমানে দুই প্রান্তের মধ্যে যাতায়াতে দীর্ঘ পথ ঘুরতে হয়। নতুন করিডর হলে সময় ও দূরত্ব দুটোই কমবে। পাশাপাশি কৌশলগত সংযোগ তৈরি হবে। এই রুটের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নেটওয়ার্ক, বিমানবন্দর, জলপথ সংযুক্ত হবে।

এর বাইরে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো – তেজপুর বিমানঘাঁটি। ভারতীয় বিমান বাহিনীর এই ঘাঁটিটি চীন সীমান্তে রণকৌশলের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিমান ঘাঁটিতে ভারতের সুকোই যুদ্ধবিমানের একটি বহর রয়েছে। এবছরের জানুয়ারি মাসে বিমান ঘাঁটিটি আরও প্রশস্ত করার জন্য প্রায় ৩৮৩ একর জমি অধিগ্রহণ করার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে সরকার।