শনিবার, মে ৩০, ২০২৬

মিলার কেন ওই সিঙ্গল নিলেন না

এপ্রিল ৯, ২০২৬ ১১:৪০ am

কেউ বুকে জড়িয়ে ধরছিলেন, কেউ পিঠ চাপড়ে দিয়ে কিছু বললেন। নিশ্চয়ই প্রশংসা আর সান্ত্বনার নানা কথাই বলছিলেন তারা! আকসার প্যাটেল, কাগিসো রাবাদা, লুঙ্গি এনগিডি, রাশিদ খানের মতো বেশ কজনই ম্যাচ শেষে চেষ্টা করছিলেন ডেভিড মিলারকে স্বাভাবিক রাখতে। কিন্তু মিলারের হতাশা ছিল স্পষ্ট, দৃশ্যমান। হেলমেট খুলে চোখ বন্ধ করে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখলেন তিনি। হয়তো ভাবছিলেন, ‘কেন যে ওই সিঙ্গলটি নিলাম না!’

তুমুল নাটকীয় ম্যাচ আর ১ রানে জয়-পরাজয়ের ফয়সালার পর ২১৯ রানের ম্যাচে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন সেটিই। মিলার কেন ওই সিঙ্গল নিলেন না? তিনি সিঙ্গল নিলে কি জিতত দিল্লি ক্যাপিটালস?

আইপিএলে বুধবার গুজরাট টাইটান্সের বিপক্ষে ঘরের মাঠে দিল্লিকে দারুণ এক জয়ের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন মিলারই। ৫২ বলে ৯২ রানের ইনিংস খেলে লোকেশ রাহুল যখন আউট হলেন, ২১১ রান তাড়ায় দিল্লির তখন প্রয়োজন ৩ ওভারে ৪৫ রান।

মিলার ব্যাটিংয়ে নেমেছিলেন বেশ আগেই। কিন্তু ফিল্ডিংয়ের সময় ডাইভ দিুয়ে ও পরে ব্যাটিংয়ের সময় ডাইভ দিয়ে চোট পেয়েছিলেন তিনি হাতে। তাই ক্রিজ ছেড়ে গিয়েছিলেন ১৩ ওভার শেষে। তিনি আবার মাঠে নামেন ১৭তম ওভারে। রাহুলের বিদায়ে পর ক্রিজে যান ভিপরাজ নিগাম।

অষ্টাদশ ওভারে রাবাদার বলে মিলারের একটি বাউন্ডারির পরও ওভার থেকে আসে ৯ রান। শেষ ২ ওভারে প্রয়োজন তখন ৩৬ রান। চোটের কারণে মিলারের ব্যাটিংয়ে অস্বস্তি আর চোখেমুখে ব্যথার ছাপ ছিল স্পষ্ট। গুজরাট তখন পরিষ্কার ফেভারিট।

সব সমীকরণ বদলে গেল ১৯তম ওভারে। মোহাম্মাদ সিরাজের টানা তিন বলে ছক্কা চার ছক্কা মারলেন মিলার। একটু বাউন্ডারি এলো নিগামের ব্যাট থেকেও। ওভার থেকে এলো মোট ২৩ রান!

এবার চাপে গুজরাট। শেষ ওভারে দিল্লির প্রয়োজন ১৩ রান।

শেষ পর্যন্ত হেরে গিয়ে হতাশ মিলার। ছবি: আইপিএল।

প্রাসিধ কৃষ্ণার প্রথম বলেই চার মেরে দিলেন নিগাম। তবে আউট হয়ে গেলেন তিনি পরের বলে। নতুন ব্যাটসম্যান কুলিদিপ ইয়াদাভ প্রথম বলটি চমৎকারভাবে থার্ড ম্যানে খেলে সিঙ্গল নিয়ে স্ট্রাইক দিলেন মিলারকে। ওভারের চতুর্থ বল স্লটে পেয়ে সজোরে হাঁকালেন মিলার। লং অফের ওপর দিয়ে স্টেডিয়ামের ছাদে আছড়ে পড়ে বল চলে গেল মাঠের বাইরে!

নতুন বল আনতে হলো রিজার্ভ আম্পায়ারকে। ম্যাচ তখন দিল্লির মুঠোয়। ঘরের মাঠের সমর্থকেরা আনন্দে উত্তাল। ২ বলে প্রয়োজন ২ রান।

পঞ্চম বলটি ছিল শর্ট অফ লেংথ। মিলার ঠিকঠাক টাইমিং করতে না পারলেও বল লেগ স্কয়ার লেগে। একটি রান হতে পারত অনায়াসেই। নন স্ট্রাইক প্রান্ত থেকে অর্ধেক ক্রিজ পাড়ি দিয়ে ছিলেন কুলদিপ। কিন্তু মিলার একটু ছুটে গিয়েও পরে ফিরিয়ে দিলেন কুলদিপকে। সিঙ্গল নিলেন না। শেষ বলে ভরসা রাখলেন নিজের ওপর।

শেষ বলের আগে অধিনায়ক শুবমান গিলের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ পরামর্শ করলেন বোলার প্রাসিধ। পরে বলটি করলেন স্লোয়ার শর্ট বল। মিলার পুল খেলার চেষ্টা ব্যাটে-বলে করতে পারলেন না। বল গেল কিপারের কাছে। দুই ব্যাটসম্যান চেষ্টা করলেন দৌড়ে রান নিতে। কিন্তু কিপার বাটলার নিখুঁত থ্রোয়ে বল লাগালেন স্টাম্পে। রান আউট কুলদিপ!

নাটকের শেষ অবশ্য সেখানেই নয়। ওই শর্ট ডেলিভারিটি উচ্চতার কারণে ওয়াইড ছিল কি না, জানতে রিভিউ নিলেন মিলার। লাভ অবশ্য হলো না। ডেলিভারি ছিল বৈধ। গুজরাট অবিশ্বাস্যভাবে জিতে গেল ১ রানে।

শেষের আগের বলে মিলার ওই সিঙ্গল নিলে অন্ত ম্যাচ ‘টাই’ হতো এবং সুপার ওভার নিশ্চিত হতো। কিন্তু মিলার সিঙ্গল না নেওয়ায় ‘আম-ছালা’ দুটিই গেল দিল্লির।

২০ বলে ৪১ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেও তাই ম্যাচের পর মিলারকে দেখা গেল বিধ্বস্ত।

ম্যাচের পর ক্রিকেট ওয়েবসাইট ইএসপিএনক্রিকইনফোতে আলোচনায় দক্ষিণ আফ্রিকার পেস কিংবদন্তি ডেল স্টেইন বললেন, হিসাবে গড়বড় করে ফেলেছেন মিলার।

“কুলদিপের শরীরী ভাষাতেই ফুটে উঠছিল, সেখানে সে মিলারকে বলতে চাইছিল, ‘ভরসা রাখো, পারব আমি।’ কিন্তু সে (মিলার) বলে হিট করল, রান নিত উদ্যত হলো এবং এরপর অন্য পথ বেছে নিল। সে নিজের ওপরই আস্থা রাখছিল। মাত্রই ১০৬ মিটার লম্বা ছক্কা মেরেছে, নিজের জোনে ছিল সে। অনুভব করছিল, নিজেই পারবে।”

“কিন্তু মিলারের মতো এত ভালো ক্রিকেটার যে, এরকম সিঙ্গল নেওয়া উচিত ছিল। সামনে যা আসে, সবই লুফে নিতে হয়। (সিঙ্গলটি নিলে) ড্র বা টাই হয়ে যেত ম্যাচ। এরপর শেষ বলে আরেকটি সিঙ্গল নেওয়াই যেত। কুলদিপ যদি ব্যাটে লাগাতে নাও পারত, সে (মিলার) যথেষ্ট দ্রুততায় ছুটতে পারে এবং ‘বাই’ থেকে একটি রান হতে পারত। কুলদিপ দৌড়ে যে রানটি নিতে পারেনি শেষে। হয়তো একটু দ্বিধা…আর এই ভুলগুলোর জন্যই চড়া মূল্য দিতে হয়।”

সাবেক ভারতীয় ব্যাটসম্যান আম্বাতি রায়ডুও এখানে স্টেইনের সঙ্গে একমত।

“আমিও এরকমই মনে করি। আলোচনাটা হওয়া উচিত, ‘আগে ম্যাচ টাই করে নিই, এরপর হয়তো শেষ বলে কিছু করতে পারব।’ দিল্লির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। ব্যাটিংয়ের বেশির ভাগ সময়ই তারা ম্যাচে ছিল এবং শেষে ম্যাচ টাই করার সুবর্ণ সুযোগ তাদের ছিল, এরপর জিততে পারত বা সুপার ওভারে যেতে পারত। তবে এরকম ব্যাপার হয়েই থাকে।”

তিন ম্যাচে দিল্লির এটি ছিল প্রথম হার, গুজরাটের প্রথম জয়।