মে ৪, ২০২৬ ১:২৬ pm
সংস্কার নিয়ে বিএনপি সরকার ‘প্রতারণা করছে’ বলে অভিযোগ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি।
দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, নির্বাচনের আগে দলটি যে সব প্রতিশ্রুতি জনগণের সামনে রেখেছিল, এখন তারা সে জায়গা থেকে ‘সরে এসেছে’। সংসদ অধিবেশনে দেওয়া বিএনপির নেতাদের বক্তব্যে তাদের এই অবস্থান উঠে এসেছে বলে মনে করেন তরুণ নেতারা।
কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের মুক্তিযোদ্ধা হলে রোববার এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক জাতীয় কনভেনশনে কথা বলছিলেন নেতারা।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, “সংসদের প্রথম অধিবেশনের পরেই আমি বলেছি, এটা প্রতারণা ও প্রবঞ্চণার সংসদ। আমি কেন এলাম এই সংসদে এবং কী পেলাম?
“যে অধ্যাদেশগুলো আইন করলে সরকারের ক্ষমতা বাড়বে, সেগুলোকে তারা আইনে পরিণত করেছে। কিন্তু যেগুলো সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে, সেগুলো তারা ল্যাপস করে বাতিল করে দিয়েছে।”
সরকারের সমালোচনা করে হান্নান মাসউদ বলেন, “আওয়ামী লীগের সময়ে ভোট চুরি করে নির্বাচিত বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিনিধিদের সরাতে একটি বিশেষ মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল, নির্বাচিত সরকার এসে সেটিকে আইনে পরিণত করেছে। যার মাধ্যমে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই তারা স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের অপসারণ করতে পারবে। ফলে বিরোধী দলের কাউকে তাদের অপছন্দ হলে তাকে সরিয়ে পছন্দ মত প্রশাসক বসাতে পারবে।
“আমাদের কিছু দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও বিএনপির প্রস্তাবনা অনুযায়ী পুলিশ কমিশন হয়েছে। কিন্তু সরকারে গিয়ে এটি বিএনপির পছন্দ হচ্ছে না।”
সরকার গঠনের আগে ও পরে বিএনপির চিন্তাভাবনা তুলে ধরে হান্নান মাসউদ বলেন, “তারা (বিএনপি) গুম কমিশন বাতিল করেছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিএনপিই চাচ্ছিল। কিন্তু সরকারে গিয়ে তা বাতিল করল। সংবিধান সংস্কারের যে কথা এসেছে, সেখান থেকেও বিএনপি সরে গেছে। আমরাও তাহলে নতুন সংবিধানের দাবিতে ফিরে যাবো।”
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী সেশনে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন এনসিপির যুগ্ম আহবায়ক এবং সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির সহ-প্রধান সারোয়ার তুষার।
আলোচনায় অংশ নেন দিলারা চৌধুরী এবং মির্জা হাসান।
দিলারা চৌধুরী বলেন, “১৯৯১ সালে রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে যেসব সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিল, বিএনপি ক্ষমতায় এসে তার একটিও বাস্তবায়ন করেনি। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর কী ফল হল? আমরা একটা প্রতারণামূলক দলের সাথে আমরা কাজ করছি।
“যারা প্রথম থেকে ম্যাটিকুলাসলি প্ল্যান করেছে যেন অভ্যুত্থানের পর আমরা যে স্বপ্ন দেখেছি, তা ভেস্তে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের এলিট, সিভিল-মিলিটারি-বুরোক্রেসি ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। সেকারণে তারা সংস্কারকে ভণ্ডুল করেছে।’
তিনি বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে দাড়িয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, কানাডায় যদি কোনো মন্ত্রী এরকম মিথ্যা কথা বলত, তাকে সেদিনই পদত্যাগ দিতে হত।
“নির্বাচনে দুমাসও যায়নি। এরমধ্যে আমাদের আলোচনা করতে হচ্ছে। জুলাই সনদে ও অধ্যাদেশে রেখে যাওয়া গুম, মানবাধিকার, দুদক, বিচার বিভাগসহ একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাতিল করছে সরকার। কাউন্সিল গঠন করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। যার ফলে প্রতিষ্ঠান স্বাধীন থেকে নির্বাহী বিভাগের বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারবে। কিন্তু সেটিও হয়নি। এগুলো না হলে প্রধানমন্ত্রী কতৃত্ববাদী হয়ে উঠবে। ফলে সরকারকে জুলাই সনদ ও গণভেট মানতে হবে। তা না হলে তারা হাসিনার সরকারের দিকেই ফিরে যাবে।”
জুলাই সনদকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি ‘অনন্য বিষয়’ বলে দাবি করেছেন মির্জা হাসান।
তিনি বলেন, “যার মূল কথা হলো রাষ্ট্রের যে প্রধান তিনটি অঙ্গ রয়েছে তথা বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ঠিক রাখা।
“সংবিধান সংস্কার কমিটির প্রথমদিকে যে কথা বলেছে, তার অনেককিছু র্যাডিকেল ছিল। বিশেষ একই ব্যক্তি সরকার প্রধান এবং দলের প্রধান হতে পারবে না। সেখানে বিএনপি চাপ তৈরি করার কারণে কম্প্রমাইজ করা হয়েছে। এরপরও যেটি রক্ষা হয়েছে, সেটিও অনেক বড় অর্জন ছিল। সেটাও যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারতাম!”
‘সুশীল সমাজ বলেছে, এই সনদের সঙ্গে মানুষের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু এটি ভ্রান্ত ধারণা,’ বলেন মির্জা হাসান।
“কারণ, ঐক্যমত কমিশনে আসার জনগণের মতামত নেওয়া হয়েছে, জরিপ করা হয়েছে। সমালোচনা রয়েছে যে, মানুষ গণভোটে না বুঝে ভোট দিয়েছে।
“আরেকটা কথা বলা হয়, আইন করে লাভ নেই, মানুষকে ভালো হতে হবে। এটা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য। কারণ মানুষ ফেরেস্তা না। ফলে তার হাত-পা বেঁধে দিতে হবে। এটাই সনদের মূলকথা।”
এনসিপি নেতা সরোয়ার তুষার বলেন, “বিএনপি সরকার সংস্কার করতে চায় না। অনেকে এতদিন তাদের একটি ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রথম অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর এটা পরিষ্কার যে, বিএনপি সরকার আর সংস্কার করবে না। শুধু তাই নয়, দলীয় ও নির্বাচনি ইশতেহারে যে সংস্কারের কথা তারা বলেছে, সেখানে ফেরাও বিএনপির পক্ষে সম্ভব না। তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ইতেমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলসহ সংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের মাধ্যমে তারা তা ভঙ্গ করেছে।”
সেশনের সভাপতি আখতার হোসেন বলেন, “ক্ষমতায় বাহানায় বিএনপি সরকার আর সংস্কার করতে চায় না। তারা ক্ষমতা নিরঙ্কুশ উপভোগ করতে চায়৷ বিএনপি বারবার নেট অব ডিসেন্টের কথা বলছে। অথচ, ঐকমত্য কমিশনে বিষয়টি এমনভাবে এসেছে যে, মূল বিষয়ে সবাই একমত। কারও ভিন্ন কোনো মত থাকলে তা পাশে উল্লেখ করবে। অর্থাৎ নোট অব ডিসেন্ট মুখ্য নয়। তাছাড়া গণভোটের পর বিএনপির রাজি-না রাজি আর কোনো মুখ্য বিষয়ই নয়।”
এই সেশনটি সঞ্চালনা করেন জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন।