শনিবার, মে ৩০, ২০২৬

বহুমাত্রিক ফ্যাশনে গারোদের দকবান্দা

মে ১১, ২০২৬ ১১:১৬ am

দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ব্যবহার করা পোশাক, অলংকার ও জীবনধারা সব সময়ই আলাদা আগ্রহ তৈরি করে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এমন ভিন্নধারার ফ্যাশনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

পরিচিত নকশা বা প্রচলিত ঈদ পোশাকের বাইরে অনেকেই খোঁজেন এমন কিছু, যেখানে থাকবে সংস্কৃতির ছাপ, গল্প আর স্বাতন্ত্র্য।

সেই ভাবনা থেকেই এবারের ঈদে গারো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘দকবান্দা’ নিয়ে নতুনভাবে কাজ করেছে ট্রাইবাল ক্র্যাফটস।

গারো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের মধ্যে ‘দকবান্দা’ শুধু একটি কাপড় নয়, এটি পরিচয়, ইতিহাস ও জীবনধারারও অংশ।

একসময় গারো নারীরা পুরোপুরি হাতে বুনে এই পোশাক তৈরি করতেন। সঙ্গে থাকত ‘গান্না’ নামের আরেক ধরনের পোশাকও।

এসব পোশাকের বুননে ফুটে উঠত পাহাড়ি ফুলের মোটিফ, প্রকৃতির ছাপ এবং পাড়ের অংশে চোখের আকৃতির বিশেষ নকশা, যা সাধারণ অলংকরণ নয়— বরং গারো ঐতিহ্য ও বিশ্বাসেরও প্রতীক।

ট্রাইবাল ক্র্যাফটস’ উদ্যোগটির প্রধান কুঁড়ি চিসিম বলেন, “তরুণ এবং ভিন্নধারা পছন্দ করা মানুষের মধ্যে গারো সম্প্রদায়ের খাবার, গয়না ও পোশাক নিয়ে সব সময়েই আগ্রহ দেখা যায়। সেই চিন্তা থেকেই ঈদের মতো উৎসবে চেনাপরিচিত পোশাকের বাইরে নতুন কিছু আনার চেষ্টা করা হয়েছে দকবান্দা নিয়ে, যা চলতি ফ্যাশনে অংশও হয়ে উঠতে পারে।”

তবে এই যাত্রা খুব সহজ ছিল না। কারণ গারোদের প্রাচীন দকবান্দার অনেক নকশা, রং ও ধরন সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। সংরক্ষণের অভাবে এখন আর একেবারে আদিরূপ খুঁজে পাওয়া যায় না।

তাই বর্তমানে যেসব উপাদান টিকে আছে, সেগুলোকে কীভাবে আধুনিকভাবে উপস্থাপন করলে সেটা আজকের ফ্যাশনে গ্রহণযোগ্য হবে এবং দৈনন্দিন ব্যবহারেও মানিয়ে যাবে সেই ভাবনা থেকেই পুরো সংগ্রহটি তৈরি করা হয়েছে।

এই সংগ্রহে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কারণ কুঁড়ি চিসিমের মতে, “ফ্যাশনকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সহজভাবে মিশে যেতে হয়।”

তিনি মনে করেন, ফ্যাশনের সহজীকরণ জরুরি, যাকে তিনি ‘ইজি ফ্যাশন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

অর্থাৎ এমন পোশাক, যা দেখতে আলাদা তবে পরতে জটিল নয়।

ঈদের জন্য তৈরি হওয়ায় সংগ্রহটিতে উৎসবের আবহও রাখা হয়েছে স্পষ্টভাবে। তাই রংয়ের ক্ষেত্রে বেছে নেওয়া হয়েছে সবুজ, সোনালি, গোলাপি-সোনালির মিশেল, বেগুনি ও নীলের মতো উৎসবমুখর শেইড।

শুধু রং নয়, নকশাতেও আনা হয়েছে কিছু ঝলমলে ভাব। কারণ ঈদের পোশাকে অনেকেই হালকা চকচকে বা ‘শাইন’ পছন্দ করেন।

সেই চিন্তা থেকেই দকবান্দাগুলোকে গ্ল্যামারাস লুক দেওয়া হয়েছে, তবে মূল ঐতিহ্যকে বাদ না দিয়েই।

সংগ্রহটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল- এর ব্যবহারিক দিক।

নতুনভাবে তৈরি দকবান্দাগুলো এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যা ঈদের সকাল কিংবা রাতের আয়োজন— দুই সময়েই সহজে পরা যায়।

দিনের বেলায় এটি রাখা যায় স্বাভাবিক ও আরামদায়কভাবে। আবার সন্ধ্যার পর একই পোশাক একটু গুছিয়ে নিলেই তৈরি হয় ভিন্ন আবহ।

কুঁড়ি চিসিমের ভাষায়, “দকবান্দার ব্লাউজগুলোও আধুনিকভাবে নকশা করা হয়েছে, যেন তা শুধু বিশেষ আয়োজনেই নয়, নিত্যদিনের ফ্যাশনেও ব্যবহার করা যায়।”

এই ব্লাউজগুলোর নকশা করেছেন ফ্যাশন প্রতিষ্ঠান লেবেল ইমাম হাসানের ডিজাইনার ইমাম হাসান। তার ডিজাইনে রাখা হয়েছে ‘ইজি ফ্যাশন’-এর ভাবনা, যা গারো ঐতিহ্যবাহী দকবান্দার সঙ্গে সুন্দরভাবে সমন্বয় তৈরি করেছে।

এই সংগ্রহে শুধু পোশাক নয়, ফ্যাশনের ‘ডাইভারসিটি’ বা বহুমাত্রিকতার ধারণাটিও সামনে আনা হয়েছে।

কুঁড়ি চিসিম মনে করেন, গারো হোক বা অন্য যে কোনো সম্প্রদায়- ফ্যাশনে সব মানুষের সংস্কৃতি, চিন্তা ও পরিচয়ের মিশেল থাকা উচিত। তাহলেই ফ্যাশন থাকবে জীবন্ত ও সচল।

একসময় দকবান্দা মূলত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন কুর্তা, টপস বা ড্রেসের সঙ্গে মিলিয়েও পরা যায়। আবার এটি আলাদা ‘স্টেটমেন্ট পিস’ হিসেবেও নতুনত্ব আনবে।