সোমবার, মার্চ ২, ২০২৬

রাজস্বে আলো, লেভিতে ছায়া

ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬ ৮:২৩ pm

দেশের অর্থনীতির মানচিত্রে পায়রা বন্দরের অবস্থান এখন আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘তৃতীয় করিডর’ হিসেবে পরিচিত বন্দরটি ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট প্রথম পণ্যবাহী জাহাজ ভেড়ানোর পর থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারের কোষাগারে এই বন্দর থেকে জমা পড়েছে এক হাজার ৮৩৬ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব। সংখ্যাটি দেখলে সাফল্যের গল্পই চোখে পড়ে।

কিন্তু এই উজ্জ্বল ছবির পেছনে জমে আছে ৬৫২ কোটি টাকার বেশি বকেয়া বন্দর ব্যবহারের বিনিময়ে ফি (লেভি)। এই লেভির টাকা ব্যবহার হয় বন্দরের নিজস্ব পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নকাজে। তাই রাজস্ব ঠিকমতো এলেও লেভি বকেয়া থাকলে বন্দরের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এই বকেয়াই এখন পায়রা বন্দরের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।

কাগজে সাফল্য, হিসাব খাতায় চাপ
বন্দর কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই বকেয়ার বড় অংশ এসেছে বড় আকারের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান, শিপিং এজেন্ট এবং পণ্য খালাসে যুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লেভি পরিশোধ না করেও অনেক ক্ষেত্রে পণ্য খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কোথাও আবার বিল নিয়ে আপত্তি, পুনর্নির্ধারণ বা প্রশাসনিক জটিলতার অজুহাতে অর্থ আটকা রয়েছে মাসের পর মাস।

শুরুর দিকে পায়রা বন্দরের মূল লক্ষ্য ছিল আমদানি কার্যক্রম সচল রাখা।

সেই লক্ষ্যেই নিয়মের কিছু শিথিলতা ছিল। বন্দর সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, তখন যে ছাড় দেওয়া হয়েছিল, সেটিই এখন বড় অঙ্কের বকেয়ার বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।কারা বাকি রাখছে
সবচেয়ে বড় অংশটি এসেছে কয়লা, সার, খাদ্যশস্য, পাথর ও ক্লিংকার আমদানিতে যুক্ত কিছু বড় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। পণ্য খালাস শেষ হলেও সংশ্লিষ্ট বিল ঝুলে আছে দীর্ঘদিন ধরে। শিপিং এজেন্ট ও চার্টারারদের একটি অংশের বিরুদ্ধেও লেভি পরিশোধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

জাহাজ চলে গেলেও হিসাব মেটেনি—এমন উদাহরণ কম নয়।রাবনাবাদ চ্যানেলে মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য স্থানান্তরে যুক্ত কিছু লাইটারিং ও হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠানও বকেয়ার তালিকায় রয়েছে। নির্ধারিত চার্জ নিয়মিত না দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও বন্দর ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় এসব বিষয়ে কঠোরতা দেখানো হয়নি।

সংবেদনশীল জায়গায় সরকারি নাম
সবচেয়ে আলোচিত এবং সংবেদনশীল বিষয়টি হলো সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বকেয়া। বন্দর সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, কিছু সরকারি সংস্থার আমদানি করা পণ্যের লেভি দীর্ঘদিন ধরে পরিশোধ হয়নি। ‘রাষ্ট্রীয় স্বার্থ’ ও ‘নীতিগত সিদ্ধান্ত’-এর যুক্তিতে এসব ক্ষেত্রে আদায়ে কঠোরতা দেখানো হয়নি। এতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আচরণে বৈষম্য তৈরি হয়েছে কিনা, সেই প্রশ্নও উঠছে।

তবে এত বড় অঙ্কের বকেয়া থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তালিকা প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অনেক বিষয় এখনও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে। নির্দিষ্ট নাম প্রকাশ করলে মামলা ও চুক্তিগত জটিলতা বাড়তে পারে- এই যুক্তিতেই নীরবতা।

ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকর
অভ্যন্তরীণ নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, কোথাও সময়মতো বিল উত্থাপন হয়নি, আবার কোথাও ফলোআপ ছিল দুর্বল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজস্ব আর লেভি এক জিনিস নয়। রাজস্ব যায় জাতীয় কোষাগারে, আর লেভির অর্থ দিয়ে চলে বন্দরের দৈনন্দিন পরিচালনা ও অবকাঠামো উন্নয়ন। এই অর্থ সময়মতো না এলে বন্দরের স্বনির্ভরতা বাধাগ্রস্ত হয়।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, লেভি আদায়ে শিথিলতা মানে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে ফেলা। এখনই শক্ত অবস্থান না নিলে বকেয়ার অঙ্ক আরও ফুলে উঠবে।

কর্তৃপক্ষের আশ্বাস
পায়রা বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাসুদ ইকবাল মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তিনি খুদে বার্তার জবাব দেননি। এমনকি পুরো বিষয়টি নিয়ে চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব মু. আহসান হাবীবের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ হলে জানাবেন। তারপর পায়রা বন্দরের পরিচালকের (অর্থ) অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাতে সাড়া দেননি তিনি।

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক (ট্রাফিক) আজিজুর রহমান বলেন, বকেয়া লেভি আদায়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধাপে ধাপে নোটিশ দেওয়া হচ্ছে এবং নতুন টার্মিনাল চালুর আগেই বড় অংশ আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৬৫২ কোটি টাকার বকেয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও বিস্তারিত জানাতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।