ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬ ৪:১৮ pm
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধূরী প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।
দফা-১: বাজেটের এনভেলপ বাড়ানো-শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া এবং তিন বছরে ধাপে ধাপে ‘ফিসক্যাল আপলিফট’ পরিকল্পনা-
গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রস্তাবনা হলো, আমরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। এই বরাদ্দ কোথায় কিভাবে কাদের জন্য ব্যয় হবে তা সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন।
গণসাক্ষরতার প্রস্তাবনায় বলা হয়, উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়নে ইলেকট্রনিক ক্রয় ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর বাজেট অনুযায়ী ব্যয় করার সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিতকরণের জন্য যথাযথ মেন্টরিং ও মনিটরিং জোরদার করতে হবে।
দফা-৩: উন্নয়ন ব্যয়কে অগ্রাধিকার-মিড-ডে মিল, আধুনিক ল্যাব এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা-
গণসাক্ষরতা তাদের প্রস্তাবনায় বলেছে, মিড-ডে মিল এর ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষক ও খামারীদের উৎসাহিত করতে তাঁদের নিকট থেকে নিরাপদ খাদ্য পণ্য ও উপকরণ সংগ্রহ করা। পণ্য ও উপকরণ সরবরাহে যেন কোন সিন্ডিকেট গড়ে না উঠে সেব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা।
দফা-৪: ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব- শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল পাঠ পরিকল্পনা ও লার্নিং এভিডেন্স ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু-
এ বিষয়ে প্রস্তাবনায় বলা হয়, ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় নতুন গতি আনবে, সন্দেহ নেই। তবে এক্ষেত্রে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, মেন্টরিং, মনিটরিং এবং ট্যাব সংক্রান্ত মেইনট্যানেন্স নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের জানামতে, বিগত সরকারের আমলে ক্রয় করা কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রজেক্টরসহ বিভিন্ন উপকরণ অনেক স্কুলে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এভাবে কখনো রাষ্ট্রীয় অর্থের গুরুতর অপচয় যাতে না হয় সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রস্তাবনায় বলা হয়, শ্রমবাজার ও পেশাভিত্তিক উচ্চ শিক্ষার (যেমন মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি) চাহিদা বিবেচনায় বাংলা ও ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলে আমাদের সন্তানদের জন্য সারাবিশ্বে বিচরণের নতুন দ্বার উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা ব্যাপক। তবে এই তৃতীয় ভাষা শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি থেকে শুরু করা সংগত বলে মনে করছি আমরা।
এদিকে বাংলা ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের চলমান দুর্বলতা কাটিয়ে উঠার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ভাষা শিক্ষায় অনলাইন রিসোর্স ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং আদিবাসীদের ভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দফা-৬: ইনোভেশন স্পেস-প্রতিটি উপজেলায় স্কুলে ‘রোবোটিক্স ও মেকার কর্ণার’ স্থাপন-
এই প্রেক্ষিতে প্রস্তাবনায় বলা হয়, স্কুলগুলোতে ‘ইনোভেশন স্পেস’ প্রদানের বিষয়টি গুরুত্ব বহন করে। পিকেএসএফ এর উদ্যোগে একসময় দেশের অনেক স্কুলে শিক্ষার্থীদের সৎ ও মানবিক করে তোলার লক্ষ্যে ‘সততা স্টোর’ এর মতো যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল সেগুলোকেও উৎসাহিত করা যেতে পারে।
দফা-৭: খেলাধুলা বাধ্যতামূলক- মানসিক ও শারীরিক বিকাশে মাধ্যমিক স্তরের টাইমটেবিলে স্পোর্টস পিরিয়ড অন্তর্ভুক্ত করা-
গণসাক্ষরতার প্রস্তাবনা হলো, মানসিক স্বাস্থ্য, শৃঙ্খলা ও মেধা বিকাশের জন্য খেলাধুলা, জাতীয় সংস্কৃতি ও নতুন কুঁড়িসহ সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের নানাবিধ উদ্যোগ খুবই প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। এখানে সুর্নিদিষ্ট করে ধাপে ধাপে দক্ষ শিক্ষক দেয়া আবশ্যক হবে। স্কাউট বা গার্লস গাইড এর শিক্ষকগণকে আপাতত বিকল্প হিসেবে এই দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে।
দফা-৮: পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার (কারিকুলাম ও পরীক্ষা)- মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে আইটেম ব্যাংক ও লার্নিং ট্রাজেক্টরির মাধ্যমে দক্ষতা পরিমাপ–
এ বিষয়ে প্রস্তাবনায় বলা হয়, কারিকুলাম ও পরীক্ষা পদ্ধতি রিভিউ করার সময় শ্রেণিকক্ষভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। এর ভিত্তিতে দূর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ক্লাসের ব্যবস্থা করা এবং সেইসব ক্লাসের শিক্ষকদের অতিরিক্ত প্রণোদনা/ভাতা প্রদান করা যেতে পারে। কারিকুলাম রিভিউ করার ক্ষেত্রে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করার সুপারিশ করছি। আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন কোনভাবেই অসংখ্য পরীক্ষার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে কোচিং ও গাইডনির্ভর হয়ে না উঠে, সেদিকে দৃষ্টি দেয়া সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা উচিত বলে আমরা মনে করি।
দফা-৯: শিক্ষায় মানদণ্ড নির্ধারণ- সাধারণ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষার বৈচিত্র্য বজায় রেখে ‘ন্যূনতম শিখন মান’ এক করা-
গণসাক্ষরতার প্রস্তাবনায় বলা হয়, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর সাথে আমরাও সুর মিলিয়ে বলতে চাই বাংলাদেশে শিক্ষা প্রদানকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় (কওমীসহ), ইংরেজি মাধ্যম এবং এনজিও পরিচালিতসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একটি বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের আওতায় আসতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাতে তাদের প্রয়োজনীয় মনিটরিং এবং মেন্টরিং সাপোর্ট দিতে পারে সেই ব্যবস্থাও রাখা প্রয়োজন। এর জন্য একটি ‘সমন্বিত শিক্ষা আইন’ সময়ের দাবি।
দফা-১০: ব্রিজ কোর্স- এক শিক্ষা ধারা থেকে অন্য ধারায় যাওয়ার পথ (স্কিল ক্রেডিট) সুগম করা ও মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত-
এ বিষয়ক প্রস্তাবনায় বলা হয়, ব্রিজ কোর্স চালু করা একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। তবে শুরুতে প্রাথমিক শিক্ষাকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করে সেটিকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। এরপর তাদের জন্য যেকোন ধরনের প্রফেশনাল অথবা বৃত্তিমূলক কোর্সে যুক্ত করা যেতে পারে।
দফা-১১: উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘জ্ঞান প্রতিষ্ঠানে’ রূপান্তরের লক্ষে স্টুডেন্ট লোন ও ইনোভেশন গ্র্যান্ট প্রদান-
এ নিয়ে প্রস্তাবনায় বলা হয়, অনুতাপের সাথে বলতে হয়, গবেষণায় বরাদ্দ বরাবরই অপ্রতুল ছিল। তবে নতুন বরাদ্দের ক্ষেত্রে বেসরকারি পর্যায়ে গবেষণায় অভিজ্ঞ এবং ক্রেডিবল প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। যেখানে সরকারি, বেসরকারি এবং ব্যক্তি পর্যায়ে পরিচালিত উন্নতমানের গবেষণাগুলোর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই বাছাই করে জাতীয়ভাবে একটি ডাটা ব্যাংক তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি, যা আমাদের শিক্ষার মানোন্নয়নে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়ক হবে।
দফা-১২: পাবলিক ড্যাশবোর্ড (জবাবদিহিতা)- মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে মাসিক ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি ও ক্লাসঘণ্টার জবাবদিহি নিশ্চিত করা—
এ বিষয়ক প্রস্তাবনায় বলা হয়, এক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যবহুল নাগরিক ড্যাশবোর্ডটির মানোন্নয়ন এবং একই রকম ড্যাশবোর্ড সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তর/মন্ত্রণালয় অনুসরণ করার প্রস্তাব রাখছি।