শনিবার, মে ৩০, ২০২৬

পাঁচ হাজার টাকা থেকে এখন ৩০ লাখ টাকার খামার রামুর অঞ্জনা বড়ুয়ার

মে ২১, ২০২৬ ১২:২৫ pm

একসময় সংসারে ছিল চরম অভাব। স্বামী ছিলেন মৃত্যুশয্যায়।

সেই কঠিন সময় পেরিয়ে আজ সফল ডেইরি খামার গড়ে তুলেছেন কক্সবাজারের রামুর গৃহবধূ অঞ্জনা বড়ুয়া। বর্তমানে তার খামারে রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা মূল্যের গরু। দুধ বিক্রি করে প্রতি মাসে আয় করছেন লক্ষাধিক টাকা।অঞ্জনা বড়ুয়ার বাড়ি কক্সবাজারের রামু উপজেলা রাজারকুল ইউনিয়নের পূর্ব রাজারকুল বড়ুয়া পাড়ায়।

তার বড় ছেলে নিলয় বড়ুয়া স্থানীয় খিজারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং ছোট ছেলে পূর্ব রাজারকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।অঞ্জনার স্বামী নিতুপূর্ণ বড়ুয়া পেশায় একজন নলকূপ মেকানিক। ২০১৬ সালের শেষ দিকে পূর্ব মেরং লোয়ার এলাকায় একটি বাড়িতে নলকূপ বসানোর সময় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তার শরীরের বেশির ভাগ অংশ পুড়ে যায়। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

দীর্ঘ তিন মাস চিকিৎসার পর তিনি বাড়ি ফিরলেও পরিবারে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ।অঞ্জনা বড়ুয়া জানান, স্বামীর চিকিৎসা, দুই সন্তান ও সংসারের খরচ সামলাতে তখন হিমশিম খেতে হচ্ছিল। এমন সময় তার চাচাতো বোন মিলি স্বামীর ওষুধ ও ফল কেনার জন্য পাঁচ হাজার টাকা সহায়তা করেন। সেই টাকাই হয়ে ওঠে জীবনের নতুন সংগ্রামের পুঁজি।

চার হাজার টাকা দিয়ে তিনি এক কানি জমি বর্গা নেন এবং বাকি টাকা দিয়ে বীজ ও সার কিনে বরবটি ও ধানের চাষ শুরু করেন।

বরবটির ভালো ফলনের কারণে এলাকায় তিনি ‘অঞ্জনা সীম’ নামে পরিচিতি পান। পরে সীম বিক্রির টাকা জমিয়ে একটি ছাগল কেনেন। সেই ছাগল থেকেই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তার মূলধন।পরবর্তী সময়ে ছাগল বিক্রি করে সাইওয়াল জাতের একটি বাছুর কেনেন। এরপর আরো জমি বর্গা নিয়ে গরু পালন শুরু করেন। একসময় প্রতিদিন পাঁচ লিটার দুধ উৎপাদন হতো। ছেলে নিলয়কে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে দুধ বিক্রি করতেন তিনি।

দুধের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের অন্যদের কাছ থেকেও দুধ কিনে বিক্রি শুরু করেন অঞ্জনা। পরে নিজের খামার সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেন। দেশি তিনটি গরু বিক্রি, ধান ও দুধ বিক্রির সঞ্চয় এবং সুদে নেওয়া টাকাসহ মোট তিন লাখ ১৫ হাজার টাকার বেশি বিনিয়োগ করে বিদেশি জাতের সাইওয়াল গাভী কেনেন।

সেই গাভী থেকেই তার খামারের যাত্রা শুরু। বর্তমানে খামারে গাভী ও বাছুর মিলিয়ে রয়েছে ১২টি গরু। প্রতিদিন ছয়টি গাভী থেকে মোট ৩২ থেকে ৩৫ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। মাসে আয় হয় প্রায় এক লাখ থেকে এক লাখ ১০ হাজার টাকা।

সম্প্রতি কোরবানির ঈদের আগে দুটি গরু বিক্রি করে দুই লাখ টাকা আয় করেছেন অঞ্জনা। তিনি জানান, খামারের আয় থেকে স্বামীর চিকিৎসার সাড়ে সাত লাখ টাকার দেনা পরিশোধ করেছেন। পাশাপাশি পূর্ব রাজারকুল ও পূর্ব মেরংলোয়ায় চার গন্ডা জমিও কিনেছেন।

অঞ্জনা বড়ুয়া বলেন, ‘অনেক কষ্ট করেছি। এখন উপরওয়ালার রহমতে ভালো আছি। স্বামীও কাজে সহযোগিতা করে। আমি চাই নারীরা ঘরে বসে না থেকে নিজেদের কিছু করার চেষ্টা করুক।’

অঞ্জনার বড় ছেলে নিলয় বড়ুয়া জানায়, তাদের পরিবারের সদস্যদের মতোই মা গরুগুলোকেও নাম ধরে ডাকেন। গরুগুলোর নাম রাখা হয়েছে লক্ষ্মী, মজনী, সুন্দরী, চঞ্চুরানী, ধলুনী, ছিয়ামী, খরগুসসা, রাজাবাবু, কালা রাজা ও পূর্ণিমা।

স্বামী নিতুপূর্ণ বড়ুয়া বলেন, ‘আমি অসুস্থ হওয়ার পরও আমার স্ত্রী থেমে থাকেনি। দুই সন্তান ও আমাকে নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে সংসারকে এগিয়ে নিয়েছে। আজ অঞ্জনার কারণেই আমরা সফল।’

স্থানীয় সুজিত বড়ুয়া বলেন, ‘নিজে না খেয়ে, সন্তানদের না খাইয়ে গরুকে খাওয়াইছে। অঞ্জনা খুবই পরিশ্রমী একজন নারী। তাই সে সফল হয়েছে।’

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা রতন বড়ুয়া বলেন, ‘অঞ্জনা শান্তপ্রিয় ও কঠোর পরিশ্রমী নারী। সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন পুরস্কারও পেয়েছে।’

রামু উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. অসীম বরণ সেন বলেন, ‘আমি যোগদানের পর থেকেই অঞ্জনাকে চিনি। সে নিয়মিত অফিসে এসে পরামর্শ নেয়। গরুর কোনো সমস্যা হলে ফোন দেয়, আমরা দ্রুত সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। অফিস থেকে তাকে বিভিন্ন সময় ভ্যাকসিন, ওষুধ, ঘাস কাটার মেশিন ও দুধ দোহনের মেশিন দেওয়া হয়েছে। তার আগ্রহ ও পরিশ্রম দেখে আমরা মুগ্ধ।’

স্থানীয়দের মতে, অঞ্জনা বড়ুয়ার এই সাফল্য এলাকার নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে।