ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬ ১২:১৬ pm
দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার পেছনে এই সাবেক গভর্নর নিজে দায়ী বলে অভিযোগ রয়েছে। কারণ ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয় কড়াকড়ি মুদ্রানীতি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যুক্তিতে নীতি সুদহার বাড়ানো হয় ১০ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে ব্যাংকঋণের সুদ বেড়ে ১৬ শতাংশের ঘরে পৌঁছায়। ঋণের এমন ব্যয়বহুল পরিবেশে শিল্প ও ব্যবসা খাত কার্যত হাঁপিয়ে ওঠে। অথচ এত কড়াকড়ির পরও মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত হারে নামেনি।
সমালোচকরা বলছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির জন্য হয়ে দাঁড়ায় অনিশ্চয়তার আরেক নাম। দেশের শীর্ষ শিল্প গ্রুপগুলোকে চাপে ফেলে অর্থনৈতিক শুদ্ধি আনার চেষ্টা, সেটি কাঙ্ক্ষিত ফল না দিয়ে বরং বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির গতিপথে ছায়া ফেলেছে। প্রশ্ন উঠছে, যুদ্ধের ফল কোথায়? আর এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো কি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে ঘিরে নতুন করে একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। গত সপ্তাহে কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এসব অনিয়ম বন্ধ করার জন্য গভর্নরকে চিঠিও দিয়েছিলেন কর্মকর্তারা। লিখিত অভিযোগের একটি অংশে বলা হয়েছে, গভর্নর সচিবালয় থেকে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) দাপ্তরিক নোটের মাধ্যমে নিয়মিত বিরতিতে ফ্রিজকৃত ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কাঠামো অনুযায়ী এ ধরনের স্পর্শকাতর ও গোপনীয় তথ্য গভর্নর অফিসে সংরক্ষণ বা একান্ত সচিবের কাছে রাখার বিধান নেই। অভিযোগ উঠেছে, বিএফআইইউ থেকে প্রাপ্ত এসব তথ্য গভর্নরের স্ত্রী ও তাঁর একান্ত সচিব কামরুল ইসলামের যোগসাজশে একটি সিন্ডিকেটের কাছে পাচার করা হচ্ছে।
অভিযোগে আরো বলা হয়, ওই সিন্ডিকেট ফ্রিজ থাকা হিসাব সচল করার তদবিরের নামে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় করেছে। যদিও এসংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তবে বিষয়টি আর্থিক খাতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, অভিযোগ সত্য হলে তা বিএফআইইউয়ের অপারেশনাল স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এদিকে গভর্নরের পরিবারের ব্যক্তিগত পছন্দে প্রাধিকার বহির্ভূতভাবে বিলাসবহুল গাড়ি কেনার অভিযোগও উঠেছে। জানা গেছে, সাবেক গভর্নরের ব্যবহারের জন্য সম্প্রতি কেনা একটি সচল গাড়ি থাকা সত্ত্বেও সরকারি ‘৮ বছরের ক্রয়সীমা’ ও ব্যয় সংকোচননীতি উপেক্ষা করে প্রায় দুই কোটি টাকার বেশি মূল্যের একটি বিলাসবহুল মাল্টিপারপাস ভেহিক্যাল (এমপিভি) কেনা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, গভর্নরের স্ত্রীর ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী গাড়িটি কেনার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজকে উপেক্ষা করে এবং যথাযথ দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই গাড়িটি কেনা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, গাড়িটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদিত স্ট্যান্ডার্ড যানবাহনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নয় এবং ভবিষ্যতে এটি পরবর্তী গভর্নরের ব্যবহারের উপযোগী না-ও হতে পারে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে গভর্নর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে আর্থিক খাত ও প্রশাসনিক মহলে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে যোগ দেন আহসান এইচ মনসুর। এর পর থেকেই শুরু করেন ব্যাংক খাতে পরিবর্তন। এর মধ্যে এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উদঘাটন, ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ, ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন, দেশের শীর্ষ শীল্পগোষ্ঠীগুলোর দুর্নীতি অনুসন্ধানে যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নামে পলিসি রেট বাড়িয়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে নামিয়েছেন সাবেক এই গভর্নর।