সোমবার, মার্চ ২, ২০২৬

এক প্লেট ইফতারে খরচ পড়ছে ১৬৮ টাকা

ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৬ ১১:৪২ am

পবিত্র রমজানের শুরুতেই রাজধানীর কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে ইফতারসামগ্রীর দোকানে পণ্যমূল্যে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। গত বছরের তুলনায় এ বছর ইফতারের প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার সরকারি আশ্বাসের পরও বাজারে পণ্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় নাভিশ্বাস মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষের।

ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ লেবুর শরবত।

গতকাল শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, লেবুর দাম রীতিমতো অস্বাভাবিক। এক হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা, যা গত বছর ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা। সেই হিসাবে লেবুর দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।এক গাস শরবত তৈরি করতে প্রয়োজন মাঝারি মানের একটি লেবু।

একটি লেবুর দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ১০ থেকে ১৫ টাকা। লেবুর শরবত তৈরি করতে সঙ্গে প্রয়োজন চিনি। এক গ্লাস লেবুর শরবত তৈরি করতে দুই-তিন টাকার চিনি লাগে। গত বছর রমজানের তুলনায় এবারের রমজানে প্রতি কেজি চিনিতে দাম বেড়েছে ১০ টাকা।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ইফতার আয়োজনে যদি বেগুনি, আলুর চপ, পিঁয়াজু, ডিমচপ, খেজুর, মুড়ি, শসা, ছোলা, জিলাপি, বুন্দিয়া, আপেল, কলা, মাল্টা, আঙুর—এই আইটেমগুলো রাখতে হয় তাহলে প্লেটপ্রতি খরচ হবে ১৬৮ টাকার মতো। একই পণ্য গত বছর রমজানে কিনতে লাগত ৩৪ টাকার মতো কম। সেই হিসাবে এবার প্রায় ২৬ শতাংশের মতো দাম বেড়েছে।

ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ খেজুর। এক কেজি বরই খেজুরের দাম ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা।প্রতি কেজিতে প্রায় ২০০ থেকে ২২৫টি হয়। সেই হিসাবে দুটি খেজুরের দাম চার টাকা। প্রতি কেজি খেজুরে এবার দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়েছে। মুড়ির কেজি ৯০ টাকা। একজন যদি ১০০ গ্রাম মুড়ি খান তাহলে দাম পড়বে ১০ টাকা। ছোলার কেজি ৭৫ থেকে ৯০ টাকা। কিন্তু বাইরে ভাজা ছোলা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। একজন যদি ১০০ গ্রাম ছোলা খান তাহলে খরচ পড়বে ২০ টাকা। আলুর চপ ১০ টাকা, পিঁয়াজু ১০ টাকা, বেগুনি ১০ টাকা, ডিমচপ ২০ টাকা। বুন্দিয়ার কেজি ২০০ টাকা, একজন ৫০ গ্রাম বুন্দিয়া খেলে দাম পড়বে ১০ টাকা। শসা বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা কেজি। গত রমজানের তুলনায় কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। মাঝারি মানের শসা কেজিতে ৬টি হয়। সেই হিসাবে একটি শসার দাম ২০ টাকা। একজন যদি অর্ধেক শসা খান দাম পড়বে ১০ টাকা। বেগুনের কেজি ১২০ টাকা।

ইফতারের অপরিহার্য অংশ ফল। সেই ফলের বাজারেও স্বস্তি নেই। আপেল ও মাল্টা, আঙুরের দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেড়ে ৪০০ টাকা ছাড়িয়েছে। আপেলের কেজি ৪২০ টাকা। এক কেজিতে হয় আটটি। সেই হিসাবে একটি আপেলের দাম ৫২ টাকার বেশি। একটি আপেলকে আট টুকরায় ভাগ করলে প্রতি টুকরার দাম পড়বে সাড়ে ছয় টাকা। ইফতারে দুই টুকরার দাম পড়বে প্রায় ১৩ টাকা। মাল্টার কেজি ৪০০ টাকা। মাঝারি আকারের মাল্টা প্রতি কেজিতে পাঁচ-ছয়টি হয়। সেই হিসাবে প্রতিটি মাল্টার দাম পড়ে প্রায় ৮০ টাকা। একটি মাল্টা আটটি টুকরায় ভাগ করলে প্রতি টুকরার দাম ১০ টাকা। একজন যদি দুই টুকরা মাল্টা খান তাহলে খরচ হবে ২০ টাকা। আঙুরের কেজি ৪৫০ টাকা। এক কেজিতে ৪০০ থেকে ৪৫০টি হয়। সেই হিসাবে দুটি আঙুর খেতে খরচ পড়বে দুই টাকা। এবার কলার বাজারেও আগুন। এক হালি কলার দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা। সেই হিসাবে একটি কলার দাম ১২ থেকে ১৫ টাকা।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী অপু ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছরই রমজান এলে দাম বাড়ে, এবারও ইফতারের প্রতিটি জিনিসের দাম বেড়েছে। কিন্তু আমাদের তো আয় বাড়েনি। ফলে ইফতারসামগ্রী কিনতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

অন্যদিকে বিক্রেতাদের দাবি—পাইকারি বাজারে দাম বেশি এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়ছে। কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতা মাহিম মিঞা বলেন, ‘আমরা বেশি দামে কিনে সামান্য লাভে বিক্রি করছি। আড়ত থেকে পণ্য আনতেই আগের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হচ্ছে।’

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের কথা বলছে। এর মধ্যে তাদের দুই স্থানে বাধার মুখে পড়তে দেখা গেছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজারে ছোলার দাম বেশি রাখার অভিযোগে দুই ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেন ভোক্তার কর্মকর্তারা। ওই সময় বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতিসহ অন্য ব্যবসায়ীরা উত্তেজিত হয়ে হৈচৈ শুরু করেন। পরে ব্যবসায়ীদের তোপের মুখে অভিযান পরিচালনা বন্ধ করে সরে আসেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

এদিকে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রংপুর সিটি বাজারে অভিযান চালাতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের তোপের মুখে পড়েন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। অভিযানের সময় মাছবাজারে রঙিন লাইট লাগিয়ে ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেন ভোক্তার কর্মকর্তারা। এ সময় বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোস্তফা কামালসহ অন্য ব্যবসায়ীরা উত্তেজিত হয়ে অভিযান বন্ধ করতে চাপ সৃষ্টি করেন। পরে ব্যবসায়ীদের তোপের মুখে অভিযান পরিচালনা বন্ধ করে সরে আসেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।