জানুয়ারি ২২, ২০২৬ ৫:৩৮ pm
এর আগে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার শাসনামলে বাংলাদেশে দুইটি গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও সেগুলো জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে গণভোটের দিন একটি ব্যালটেই হ্যাঁ/না ভোট দিয়েছেন ভোটাররা।
একটি পরিপত্রের মাধ্যমে ইসি জানিয়েছে, দুটি আলাদা ব্যালট পেপারের মাধ্যমে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে এবং ভোটগ্রহণ শেষে একই সঙ্গে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল গণনা করা হবে।
আবার এবারই প্রথম প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিভিন্ন দেশে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে।
গণভোট নিয়ে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন একটি পরিপত্র জারি করেছে। এই পরিপত্রে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত, নির্ধারিত এবং সরবারহকৃত স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সই গণভোটের বাক্স হিসাবে ব্যবহৃত হবে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটার জাতীয় নির্বাচনের ব্যালট ও গণভোটের ব্যালটে সিল দেওয়ার পর সেটি একই বাক্সে ফেলবেন। ১২ ফেব্রুয়ারি বিকাল সাড়ে ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষে প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতিতে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ব্যালট আলাদা করবেন এবং আলাদা করেই এজেন্টদের উপস্থিতিতে ভোট গণনা করতে হবে।
ভোট গণনা শেষে প্রতিটি কেন্দ্রে একটি আলাদা ফরমে, আলাদা আলাদা ঘরে ‘হ্যাঁ’ ভোট ও ‘না’ ভোট গণনা করে সেটি কেন্দ্রে টানিয়ে দিতে হবে। একইভাবে সংসদ নির্বাচনের ভোটের পরিমাণও আলাদা ফরমে যোগ করতে হবে।
প্রবাসী ও দেশের মধ্যে যারা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছে, তাদের ভোটও একই সঙ্গে যোগ করে গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে টানিয়ে দেবেন স্ব স্ব কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা।
পরে প্রতিটি আসনভিত্তিকও একইভাবে দুইটি ভোটের ফলাফল যোগ করে সেটি স্বাক্ষর করে নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন রিটার্নিং অফিসার।
একটি ব্যালটে ভোট দেওয়া যাবে?
১৯৯১ সালের গণভোটের প্রায় ৩৫ বছর পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশের তৃতীয় গণভোট। এবার সারা দেশে যেসব নির্বাচন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন তাদের জন্য এই গণভোট একটি নতুন অভিজ্ঞতা। যে কারণে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে সারা দেশের প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেবে নির্বাচন কমিশন।
ইসি বলছে, গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের ব্যালট প্রদান, গণনা ও ভোটারদের জন্য কী কী পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে তার একটি নির্দেশনাও দেবে কমিশন।
আবার এবার যারা ভোট দেবেন তাদেরও অনেকের হ্যাঁ/না ভোট বা গণভোটে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা নেই। ফলে গণভোট নিয়ে প্রশ্নও আছে অনেকের মনে। আবার কী কী বিষয়ের ওপর গণভোট হচ্ছে সেগুলো নিয়েও অনেকের মধ্যে কনফিউশন আছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কয়েকজন ভোটার বলেছেন যে, তারা শুধু সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে চান, কিন্তু গণভোটে ভোট দেওয়ার আগ্রহ তাদের নেই।
এই প্রশ্ন করা হয়েছিল পাবনার ঈশ্বরদীর ষাটোর্ধ্ব দেলোয়ার হোসেনের কাছে। তিনি জানান, যেসব সংস্কার প্রস্তাবের ওপর এবারে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে তার অনেকগুলোর সঙ্কে তিনি একমত। আর কিছু কিছু প্রস্তাবের সঙ্গে তিনি একমত নন। যে কারণে তিনি সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে চান, কিন্তু গণভোটে ভোট দিতে চান না।
তার মতো যদি কোনো ভোটার দুটি ব্যালটের মধ্যে একটিতে ভোট দিতে চান তাহলে সেই সুযোগ আছে কি-না সেই প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সহকারী সচিব মতিয়ুর রহমান বলেন, ‘একটি ব্যালট দেওয়ার কোনো সুযোগ এবার থাকছে না’।
তার ভাষ্য, একই সঙ্কে একজন ভোটারকে দুইটি ব্যালটই সরবরাহ করা হবে। যদি কোনো ভোটার একটি ব্যালট নিতে চান তাহলে তাকে শুধু সংসদ নির্বাচন বা গণভোটের একটি ব্যালট দেওয়া হবে না।
নির্বাচন কমিশনের সূত্রগুলো বলছে- যদি কোনো ভোটার গণভোটে ভোট না দিতে চান তাহলেও তাকে ব্যালট নিতে হবে। তিনি ভোট দেন আর না দেন, তার দুটি ব্যালটই ভাঁজ করে বাক্সে ফেলতে হবে।
গণনার সময় যদি এমন ফাঁকা ব্যালট ভোটের বাক্সে পাওয়া যায়, তবে নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী সেই ব্যালটগুলো বাতিল বলেই গণ্য হবে।
ইসির এ কর্মকর্তা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের উদাহরণ টেনে জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তিনটি পদের আলাদা তিনটি ব্যালট সরবরাহ করা হয়। কোনো ভোটার যদি একটি মাত্র ব্যালট নিতে চান তাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয় না।
গণভোটের ক্ষেত্রে ঠিক এই বিষয়গুলোই অনুসরণ করবে নির্বাচন কমিশন এবং সেই নির্দেশনাও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে মাঠের নির্বাচন কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে।
গণভোটের চারটি প্রশ্ন
গত বছরের অক্টোবরে রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে সাক্ষরের পর গত নভেম্বরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দেন। এক্ষেত্রে একই দিনে দুইটি ভোট আয়োজনে নির্বাচন কমিশনের সামনে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে গণভোট আয়োজনের সব প্রস্তুতি শেষ করেছে।
সরকার যে জুলাই সনদ তৈরি করেছে সেখানে ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার ও ৩৭টি আইন ও বিধি সংস্কারের তালিকা তৈরি করেছে। যার সংক্ষিপ্ত অংশ তৈরি করা হয়েছে গণভোটের ব্যালটের জন্য। সেখানে ছোট করে মাত্র চারটি পয়েন্ট যুক্ত করা হয়েছে। ভোটারদের সেই বিষয়গুলো পড়েই জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোটের ব্যালটে হ্যাঁ অথবা না ভোট দিতে হবে।
এবার গণভোটের ব্যালটে যে চারটি পয়েন্ট যুক্ত করা হয়েছে তা হলো–
আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?” – (হ্যাঁ/না):
(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।
(খ) আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।
(গ) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হইয়াছে—সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে।
(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।