বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২৭, ২০২৬

আবাসিক হোটেলে নৈতিক অবক্ষয়: দায় কার, প্রতিরোধের পথই বা কী?

আগস্ট ১৭, ২০২৬ ১:০০ pm

আবাসিক হোটেলে নৈতিক অবক্ষয়: দায় কার, প্রতিরোধের পথই বা কী?

এসএম. শান্ত মাহমুদ বিজয়
সমাজকর্ম বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

দেশের আবাসিক হোটেল মানুষের ভ্রমণ, ব্যবসা, চিকিৎসা ও বৈধ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে আবাসনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে কিছু আবাসিক হোটেলকে ঘিরে মাদক, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল, মানবপাচার, যৌন শোষণ ও সহিংসতার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। কখনো কখনো এসব ঘটনার পরিণতি গুরুতর আহত হওয়া কিংবা মৃত্যুতেও গড়িয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই সমস্যার দায় কার এবং এর স্থায়ী প্রতিরোধের পথই বা কী?

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—কোনো নারী ও পুরুষ একসঙ্গে আবাসিক হোটেলে অবস্থান করলেই সেটিকে অনৈতিক বা অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। বৈধ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, চিকিৎসা, ব্যবসায়িক বা ভ্রমণের প্রয়োজনে হোটেলে অবস্থান করা নাগরিকের অধিকার। অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণ, তদন্ত ও আইনের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করতে হবে।

সমস্যার পেছনে শুধু নৈতিকতার ঘাটতি নয়

কিছু মানুষ কেন যৌন শোষণ, পাচার, প্রতারণা বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পড়ছেন—এর উত্তর শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার মধ্যে খুঁজলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশে মানবপাচার বিষয়ে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (UNODC) এবং সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের গবেষণায় মানবপাচারের বিভিন্ন ধরন, ঝুঁকি ও শোষণের বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মানবপাচারের ক্ষেত্রে চাকরি বা উন্নত জীবনের প্রলোভন, প্রতারণা এবং দুর্বল সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থাকে কাজে লাগানোর মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—পাচারের শিকার নারীকে স্বেচ্ছায় অপরাধে জড়িত ব্যক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জবরদস্তি, প্রতারণা বা শোষণের শিকার ব্যক্তির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো তাকে সুরক্ষা ও পুনর্বাসন দেওয়া।

নারীর অর্থনৈতিক দুর্বলতা কি ঝুঁকি বাড়ায়?

বাংলাদেশের নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ এখনও পুরুষের তুলনায় অনেক কম। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৩৮.৬ শতাংশ, যেখানে পুরুষের হার ৮০.৪ শতাংশ।

এই তথ্য থেকে অবশ্যই বলা যাবে না যে চাকরির অভাব সরাসরি কোনো নারীকে আবাসিক হোটেলে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়ে যায়। এমন সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্কের জাতীয় গবেষণা নেই।

কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও কর্মসংস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ প্রতারণা, পাচার ও শোষণের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন—এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই নারীর নিরাপদ কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে অপরাধ প্রতিরোধের অংশ হিসেবেই দেখতে হবে।

পারিবারিক সংকটও উপেক্ষা করা যাবে না

বিবাহবিচ্ছেদ, পারিবারিক কলহ বা দাম্পত্য সহিংসতা কোনো নারীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত করে—এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে পারিবারিক সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা একজন নারীকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও UNFPA-এর Violence Against Women Survey 2024-এ ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ২৭,৪৭৬ জন নারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটি দেশের নারীর ওপর সহিংসতা নিয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তৃত জাতীয় জরিপগুলোর একটি।

UNFPA-এর প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় চারজন নারীর মধ্যে তিনজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অন্তরঙ্গ সঙ্গীর কাছ থেকে শারীরিক, যৌন, মানসিক, অর্থনৈতিক সহিংসতা বা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। গত ১২ মাসের ক্ষেত্রেও সহিংসতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

অর্থাৎ নারীর নিরাপত্তা ও পারিবারিক পরিবেশের সংকটকে সমাজের বৃহত্তর সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে।

আবাসিক হোটেলে অপরাধের ঘটনাও বাস্তব

আবাসিক হোটেলকে ঘিরে বিচ্ছিন্ন অপরাধ ও মৃত্যুর ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে মগবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসা এক দম্পতি ও তাঁদের সন্তানের মৃত্যু হয়। পুলিশ প্রাথমিকভাবে খাবারে বিষক্রিয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল এবং পরে ঘটনাটি নিয়ে তদন্তও হয়।

আবার ২০২৬ সালের জুনে গুলিস্তানের একটি আবাসিক হোটেল থেকে এক সৌদিপ্রবাসীর অচেতন অবস্থায় উদ্ধারের পর হাসপাতালে মৃত্যু হওয়ার খবরও প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়।

এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে আবাসিক হোটেলের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে দেশের সব আবাসিক হোটেলের পরিস্থিতি সম্পর্কে জাতীয় সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সঠিক নয়।

রাষ্ট্রের দায় কোথায়?

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অভিযান চালানো নয়; অপরাধের ঝুঁকি কমানোর সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

প্রথমত, নারীদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা সহায়তা ও শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পারিবারিক সহিংসতা বা বিচ্ছেদের কারণে ঝুঁকিতে পড়া নারীদের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজন। নিরাপদ আশ্রয়, আইনি সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নারী বা শিশুকে পাচার ও শোষণের মধ্যে ঠেলে দেওয়া দালাল ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

চতুর্থত, আবাসিক হোটেলের লাইসেন্স, নিরাপত্তা, অতিথির পরিচয় যাচাই এবং প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংরক্ষণের আইনগত বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

পঞ্চমত, কোনো হোটেল কর্তৃপক্ষ অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করলে বা জেনেশুনে অপরাধের সুযোগ দিলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

ষষ্ঠত, প্রশাসনের ভেতরে দুর্নীতি, ঘুষ বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ থাকলে সেগুলোরও তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী চক্রকে যেমন ছাড় দেওয়া যাবে না, তেমনি প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিরপরাধ নাগরিককেও হয়রানি করা যাবে না।

শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন পুনর্বাসন

এই সমস্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অপরাধী ও ভুক্তভোগীকে এক করে দেখা যাবে না।

যদি কোনো নারী মানবপাচার, প্রতারণা, জবরদস্তি বা যৌন শোষণের শিকার হন, তাহলে তাকে অপমান বা সামাজিকভাবে হেয় না করে নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, আইনি সহায়তা এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ দিতে হবে।

অন্যদিকে, কেউ অপরাধে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। কিন্তু প্রকৃত ভুক্তভোগীদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করলে তারা ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সহায়তা চাইতে আরও ভয় পাবেন।

তথ্যের ঘাটতি দূর করা জরুরি

এই সমস্যার একটি বড় দুর্বলতা হলো নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যের ঘাটতি।

বাংলাদেশে মোট কতটি আবাসিক হোটেলে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তার মধ্যে কতটি মানবপাচার, কতটি মাদক, কতটি ব্ল্যাকমেইল, কতটি সহিংসতা কিংবা মৃত্যুর ঘটনা—এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রকাশিত একটি সমন্বিত জাতীয় পরিসংখ্যান সহজলভ্য নয়।

বিশেষ করে সারা দেশে কত নারী আবাসিক হোটেলে যৌন বা তথাকথিত ‘অনৈতিক’ কর্মকাণ্ডে যুক্ত—এমন নির্ভরযোগ্য সরকারি জাতীয় সংখ্যা বর্তমানে উল্লেখ করা উচিত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবি বা বিচ্ছিন্ন অভিযানের সংখ্যা দিয়ে জাতীয় পরিসংখ্যান তৈরি করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

তাই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ পুলিশ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য সমন্বয় করে একটি জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা প্রয়োজন।

সমাজের দায়িত্বও কম নয়

নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরির প্রথম জায়গা পরিবার। সন্তানদের নৈতিকতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ববোধ ও নিরাপদ আচরণ শেখাতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের পাশাপাশি মাদক, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল, মানবপাচার এবং অনলাইন শোষণ সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

একই সঙ্গে কোনো নারীকে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনুমান, অপমান বা সামাজিক বিচারের মুখোমুখি না করে প্রকৃত অপরাধী ও শোষণকারী চক্রকে শনাক্ত করাই হতে হবে সমাজের লক্ষ্য।

শেষ কথা

আবাসিক হোটেলকে অপরাধের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হতে দেওয়া যাবে না। আবার সব আবাসিক হোটেল, সব নারী কিংবা নারী-পুরুষের বৈধ সম্পর্ককে সন্দেহের চোখে দেখাও কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।

সমাধান শুধু অভিযান নয়। প্রয়োজন আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, প্রশাসনিক জবাবদিহি, মানবপাচার প্রতিরোধ, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, নিরাপদ কর্মসংস্থান, পারিবারিক সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভুক্তভোগীর পুনর্বাসন।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধীকে ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; একজন নাগরিক যাতে অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব, পারিবারিক সহিংসতা, প্রতারণা বা পাচারের কারণে শোষণের শিকার না হন—সেই নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হোক, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত হোক এবং আবাসিক হোটেলগুলো হোক নিরাপদ ও বৈধ আবাসনের স্থান—এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত লক্ষ্য।

এসএম. শান্ত মাহমুদ বিজয়
সমাজকর্ম বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা