শনিবার, মে ৩০, ২০২৬

পদত্যাগ করলেই প্রতিশোধ, প্রথম আলোর ভেতরের চাঞ্চল্যকর চিত্র

মে ২৫, ২০২৬ ১১:১৭ am

বাইরে কর্মীবান্ধব পরিবেশের কথা বলা হলেও দৈনিক প্রথম আলোর ভেতরে ভিন্ন এক বাস্তবতার চিত্র উঠে এসেছে। চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেই সাংবাদিকদের প্রতি প্রতিষ্ঠানটির ক্ষোভ ও প্রতিশোধমূলক আচরণের অভিযোগ মিলেছে।

তরুণ লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক এবং প্রথম আলোর সাবেক ফটোসাংবাদিক ও কনটেন্ট নির্মাতা সুদীপ্ত সালাম তাঁর বই ‘ফটোসাংবাদিকের জার্নাল: প্রথম আলোর অন্দরমহল’-এ এমনই বিস্ফোরক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন।

বইটিতে তিনি উল্লেখ করেন, ওয়েজ বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কর্মী চাকরি ছাড়তে চাইলে তাকে দুই মাস আগে নোটিশ দিতে হয়। সেই নিয়ম মেনে নিজের জন্মদিনে পদত্যাগের নোটিশ দেন সুদীপ্ত সালাম। তার পরিকল্পনা ছিল, এক মাস কাজ করে বাকি এক মাস ছুটি ভোগ করবেন।

কারণ তার জমা ছুটি ছিল যথেষ্ট।সুদীপ্ত তার বইতে লিখেছেন, তিনি বিষয়টি ভিডিও সাংবাদিকতা বিভাগের তৎকালীন প্রধান মহিউদ্দিন সাইফুল্লাহ শুভ্রকে জানান। (শুভ্রই ছয় মাস আগে তাকে এ বিভাগে নিয়ে এসেছিলেন। বিষয়টি শুনে শুভ্র বিস্মিত হয়ে পড়েন।

সুদীপ্ত ছুটি নেবেন, এটা তিনি কোনভাবে মেনে নিতে পারছিলেন না।সুদীপ্ত লিখেছেন, “আমি শুভ্রকে জানিয়েছিলাম। সে অবাক হয়ে যায়। সে তখন চাচ্ছিল, আমি আরও দুই মাস কঠোর পরিশ্রম করি, যাতে তার হারিয়ে ফেলা ভাবমূর্তি আবারও উজ্জ্বল হয়। কিন্তু আমি রাজি হইনি, কারণ ছুটি নেওয়া আমার অধিকার।

এরপর ঘটনাপ্রবাহ মোড় নেয় ভিন্ন দিকে। সুদীপ্ত অভিযোগ করেন, শুভ্র মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান শামীম খানের কাছে একটি চিঠি পাঠান, যাতে এক মাস পরই তার চাকরি শেষ করে দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী, তাকে নির্ধারিত সময়ের আগে বিদায় দেওয়া হয় এবং শেষ মাসের বেতনও দেওয়া হয়নি।

তিনি লিখেছেন, তখনও তার নতুন কোনো চাকরি ছিল না, সেই অর্থ তার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু যুক্তি দেওয়া হয়, তার ক্যামেরা ও কম্পিউটার এক মাস অব্যবহৃত পড়ে থাকতে পারবে না।

পদত্যাগের নোটিশ দেওয়ার পরপরই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অনুসন্ধান শুরু হয় বলেও বইতে উল্লেখ করেছেন সুদীপ্ত। প্রশাসন বিভাগের প্রধান উৎপল কুমার চক্রবর্তী এবং ব্যবস্থাপক এবিএম খায়েরুল কবির তার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সব ধরনের তদন্ত পরিচালনা করেন। কিন্তু কোনো অনিয়ম বা অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তার ভাষায়, কোনো অভিযোগ খুঁজে না পাওয়ায় বেতন বা অন্যান্য প্রাপ্য থেকে কাটছাঁট করার সুযোগ না পেয়ে অন্য উপায়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়। এর অংশ হিসেবে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি আটকে দেওয়া হয়।

সুদীপ্ত জানান, তিনি যখন প্রথম আলোতে যোগ দেন, তখন একটি নিয়ম ছিল অফিস থেকে দেওয়া মোটরসাইকেল ছয় বছর ব্যবহার করলে সেটির মালিকানা কর্মীর কাছে হস্তান্তর করা হবে। তিনি ২০১৪ সালের শেষদিকে একটি পুরনো মোটরসাইকেল পান এবং ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে একটি নতুন মোটরসাইকেল দেওয়া হয়।

কিন্তু পরে ব্যবস্থাপক খায়েরুল কবির জানান, ছয় বছরের হিসাব পুরনো মোটরসাইকেল থেকে ধরা হবে। আবার পরবর্তীতে নতুন করে জানানো হয়, এখন সাত বছর পূর্ণ করতে হবে।

সুদীপ্ত বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি ২০ হাজার টাকায় মোটরসাইকেলটি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু সেটিও প্রত্যাখ্যান করা হয়।

এ সময় অনেকে তাকে পরামর্শ দেন, বিষয়টি প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানকে জানাতে। কিন্তু সুদীপ্ত তা করেননি।

সুদীপ্ত সালামের এ অভিজ্ঞতা প্রথম আলোর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। কর্মীদের অধিকার, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার বিষয়টি কতটা মানা হয়, তা নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা।