শনিবার, মে ৩০, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে : ইরান

মে ২০, ২০২৬ ৫:৩৫ pm

যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে বুধবার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। এই সতর্কবার্তা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বলেছেন যে তিনি নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন।

ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে একটি সামরিক অভিযান স্থগিত করেছিলেন, যাতে যুদ্ধবিরতির সুযোগ তৈরি হয়। তবে সেই যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক আলোচনা এখন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে পরিস্থিতি আবারও উত্তেজনার দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এই উত্তেজনার মধ্যেই ইরান নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে।

তবে সেই প্রস্তাবে আগের অবস্থানেরই অনেকটা পুনরাবৃত্তি হয়েছে, যা আগে ট্রাম্প প্রশাসন প্রত্যাখ্যান করেছিল। এর মধ্যে রয়েছে—হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দাবি, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের শর্ত।ট্রাম্প সোমবার ও মঙ্গলবার বলেন, তিনি আবারও বিমান হামলার নির্দেশ দেওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। তবে শেষ মুহূর্তে কূটনৈতিক আলোচনাকে আরো সময় দিতে তিনি সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।

এর আগে নতুন হামলার সম্ভাবনার জবাবে ইরান বারবারই কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এসেছে। দেশটি বলেছে, মার্কিন ঘাঁটি আছে এমন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানো হতে পারে। এবার ইরানের অবস্থান আরো কঠোর হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বুধবার ইরান ইঙ্গিত দেয়, সম্ভাব্য পাল্টা আঘাত শুধু আঞ্চলিক সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ না-ও থাকতে পারে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, ‘ইরানের বিরুদ্ধে আবার হামলা চালানো হলে যে যুদ্ধ শুরু হবে, তা এবার শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আরো দূরে ছড়িয়ে পড়বে।

চীনা তেলবাহী জাহাজের হরমুজ প্রণালি অতিক্রম

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি পরিবহন পরিস্থিতিতেও বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। এতে বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরে সীমিত অবরোধ আরোপ করে বলে জানা যায়।

এই অবস্থার মধ্যেই প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল বহনকারী দুটি চীনা সুপারট্যাংকার বুধবার সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। যা ইরানের কিছু নির্দিষ্ট দেশের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ শিথিলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে যেসব দেশকে তারা কূটনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ মনে করে, তাদের জাহাজ চলাচলে বাধা কমানো হচ্ছে।

গত সপ্তাহে ট্রাম্পের বেইজিং সফরের সময় ইরান জানায়, চীনা জাহাজের জন্য কিছু নিয়ম শিথিল করা নিয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে। ফলে এই ট্যাংকার চলাচলকে সেই আলোচনার বাস্তব ফল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

একই দিনে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ইরানের সঙ্গে সমন্বয়ের পর একটি কোরীয় তেলবাহী জাহাজও হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছে।

শিপিং পর্যবেক্ষণ সংস্থা লয়েডস লিস্টের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে অন্তত ৫৪টি জাহাজ এই প্রণালি পার হয়েছে। যা আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। তবে যুদ্ধ শুরুর আগে দৈনিক গড়ে প্রায় ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত। এখনো সেই স্বাভাবিক অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি এই বাণিজ্য পথটি।

যুদ্ধ থামানোর রাজনৈতিক চাপ

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই যুদ্ধ বড় চাপ তৈরি করছে। আগামী নভেম্বরে কংগ্রেস নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার চাপ বাড়ছে। কারণ জ্বালানি দামের ওঠানামা ও বৃদ্ধি তার রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তি তৈরি করছে।

এপ্রিলের শেষ দিকের যুদ্ধবিরতির পর থেকে ট্রাম্পের বক্তব্যে বারবার পরিবর্তন দেখা গেছে। কখনো তিনি দ্রুত শান্তিচুক্তির কথা বলেছেন, আবার কখনো নতুন করে হামলার হুমকিও দিয়েছেন। মঙ্গলবার তিনি আবারও দাবি করেন, যুদ্ধ ‘খুব দ্রুত’ শেষ হবে।

এদিকে আলোচনায় যুক্ত মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়া ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, আলোচনা কিছুটা অগ্রগতি করেছে। হোয়াইট হাউসে ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এখন তুলনামূলক ভালো অবস্থায় আছি।’

তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। বুধবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম একসময় প্রায় ১.৫ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের নিচে নেমে আসে, যদিও এটি আগের সপ্তাহের তুলনায় এখনও বেশি।

ফুজিটোমি সিকিউরিটিসের বিশ্লেষক তোশিতাকা তাজাওয়া বলেন, বাজার এখন বুঝতে চেষ্টা করছে যে ওয়াশিংটন ও তেহরান সত্যিই কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে কি না—নাকি পরিস্থিতি আবারও সংঘাতে গড়াবে।

যুদ্ধবিরতি, হামলা ও অনিশ্চয়তা

এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতির আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয় বলে দাবি করা হয়। একই সময়ে ইসরায়েল লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালায়, যেখানে আরো বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।

অন্যদিকে ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি বহাল আছে, তবু পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি।

মে মাসের শুরুতে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে একটি নৌ অভিযান ঘোষণা করেছিলেন, যা ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে পরিচিত ছিল। তবে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই সেই অভিযান বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এরপরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। দেশ দুটি বলেছে, এসব হামলা এসেছে ইরাক থেকে, যেখানে ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠী সক্রিয়।

ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুরুতে বলেছিলেন, তাদের লক্ষ্য ছিল ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমানো, পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করা। তবে এখন পর্যন্ত ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদ, ড্রোন সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর শক্তি পুরোপুরি কমানো সম্ভব হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, যদিও ইরান অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপের মধ্যে আছে, তবু দেশটিতে এখনো বড় ধরনের সংগঠিত বিরোধিতা দেখা যায়নি।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে চলছে কূটনৈতিক আলোচনা, অন্যদিকে আবারও বাড়ছে সামরিক উত্তেজনার ঝুঁকি এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্য নতুন এক অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে।