মে ১৩, ২০২৬ ১২:০৭ pm
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ৯৬ কোটি ৮১ লাখ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১০ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরো বলেছে, ওই এলসির বিপরীতে আমদানি করা কাঁচামাল রপ্তানিতে ব্যবহারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এলসি খোলা হয়েছে তা জানতেন না রপ্তানিকারকরা!
এ ঘটনায় নাম আসা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের একজন এবং বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দাবি করেছেন, অনেক রপ্তানিকারকই জানতেন না যে তাদের নামে এলসি খোলা হয়েছে।
তার অভিযোগ, রপ্তানি আয়ের অর্থ আটকে রেখে ব্যাংকের কর্মকর্তারা জোর করে বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর নিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত শেষ হয়েছিল ২০২৩ সালেই। তবে প্রায় তিন বছর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। চলতি বছরের মার্চে এসে প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার অনুমোদিত ডিলার (এডি) লাইসেন্স বাতিল করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, তৎকালীন ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবের কারণেই ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়েছে।
তদন্তে দেখা গেছে, ব্যাংকের কর্মকর্তারাও এ কাজে সহযোগিতা করেছেন।
কোন প্রতিষ্ঠানের নামে কত অর্থ লোপাট?
টোটাল ফ্যাশন ৩৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের রপ্তানি আদেশ দেখিয়ে ২৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের এলসি খুললেও প্রকৃত রপ্তানি করেছে মাত্র ৬ কোটি ২০ লাখ ডলারের।
অ্যাভান্টি কালার টেক্স ২৯ কোটি ডলারের রপ্তানি আদেশের বিপরীতে ১৪ কোটি ৬০ লাখ ডলারের এলসি খুললেও প্রকৃত রপ্তানি ছিল মাত্র ৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার। একইভাবে ডোয়াস-ল্যান্ড অ্যাপারেলস ৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করলেও এলসি খুলেছে ২০ কোটি ৮০ লাখ ডলারের।
আহোনা নিট কম্পোজিট মাত্র ১ কোটি ৩৫ লাখ ডলারের রপ্তানি করলেও তাদের নামে ৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। এইচকে অ্যাপারেলস ৬ কোটি ৮ লাখ ডলারের রপ্তানি করলেও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খুলেছে ১২ কোটি ৬০ লাখ ডলারের।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক আরো ২৪টি কোম্পানিতে একই ধরনের অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে।
পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব কেন?
২০২৩ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক যখন তদন্ত প্রতিবেদনটি তৈরি করে, তখন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য এইচবিএম ইকবাল অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
১৯৯৯ সালে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এইচবিএম ইকবাল চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মূলত ইকবাল পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বোর্ডটি ভেঙে দিয়ে একটি নতুন বোর্ড গঠন করেন।
তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের প্রায় তিন বছর পর, চলতি বছরের মার্চে প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার অনুমোদিত ডিলার (এডি) লাইসেন্স বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, প্রতিবেদনটি আগেই প্রস্তুত করা হলেও তৎকালীন নানা চাপের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, এডি লাইসেন্সটি বাতিল করা হয়েছে এবং ‘বিলম্বে হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে’।
লাইসেন্স বাতিল করা কি যথেষ্ট?
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব বলেন, এ ধরনের অনিয়ম সাধারণত নগদ প্রণোদনা ও ভর্তুকি নেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়। বাস্তবে রপ্তানি না হলেও কাগজে-কলমে রপ্তানি দেখিয়ে সুবিধা নেওয়া হয়েছে।
এমন দুর্নীতির ক্ষেত্রে শুধু লাইসেন্স বাতিল করলেই হবে না, তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে বলে মনে করেন তিনি।