মে ১১, ২০২৬ ১১:১৯ am
প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার আসে মা দিবস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভরে যায় মায়ের ছবিতে, দোকানে দোকানে ফুলের ভিড়, উপহারের প্যাকেট। তবে এত আয়োজনের মাঝে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়— মা আসলে কী চান?
যিনি সারাটা জীবন সবার জন্য ভেবেছেন, নিজের কথা ভাবেননি— তিনি কি সত্যিই একটা দামি শাড়ি বা পারফিউমের বাক্সে খুশি হন? নাকি তার চাওয়াটা অনেক সহজ, অনেক কাছের।
মায়েরা আসলে যা খোঁজেন
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলেন, “আজকের ব্যস্ত জীবনে আমরা অনেকেই কাজ, পড়াশোনা বা ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে মায়ের সঙ্গে ঠিকমতো সময় কাটাতে পারি না। অথচ মায়েরা সবচেয়ে বেশি খুশি হন সন্তানের সময়ে, মনোযোগে আর যত্নে।”
কথাটা শুনতে সহজ, তবে আমরা কতটা মনে রাখি? মা হয়ত ফোন করেছিলেন, তবে মিটিং ছিল। হয়তো পাশে বসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু স্ক্রিনে চোখ ছিল। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই আসলে মায়ের কাছে সবচেয়ে বড় পাওনা— কিংবা সবচেয়ে বড় হারানো।
তাই এই মা দিবসে দামি উপহারের বদলে চেষ্টা করুন এমন কিছু করতে, যা সত্যিকার অর্থে মায়ের মনটা ছুঁয়ে যাবে।
ফোনটা রাখুন, মায়ের দিকে তাকান
কতদিন হল মায়ের সঙ্গে মন খুলে গল্প করা হয়নি? শুধু কুশল বিনিময় নয়, সত্যিকারের গল্প — তার ছেলেবেলার কথা, তার স্বপ্নের কথা, তার পছন্দের কথা?
এই একটা দিন ফোনটা পাশে রেখে দিন। মায়ের পাশে বসুন। একসঙ্গে চা আর আড্ডা হতে পারে। পুরোনো অ্যালবাম বের করুন। মা নিজেই গল্প শুরু করবেন, থামতে চাইবেন না। আর আপনি শুনুন— শুধু শুনুন।
এই মনোযোগটুকু, এই উপস্থিতিটুকুই মায়ের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি উপহার।
নিজের হাতে কিছু তৈরি করুন
বাজার থেকে কেনা উপহারের একটা সীমা আছে। তবে হাতে তৈরি কিছুর কোনো তুলনা হয় না।
একটা হাতে লেখা চিঠি লেখা যেতে পারে। খুব বড় করতে হবে না। শুধু বলুন, মা তুমি আমার জীবনে কতটা জরুরি। কিংবা পুরানো ছবিগুলো দিয়ে একটা ছোট অ্যালবাম তৈরি করা। যে ছবিতে মা তরুণ, হাসছেন, অন্যরকম দেখাচ্ছেন।
“এই ছোট আয়োজনে মা বুঝতে পারবেন, আপনি সময় নিয়েছেন, ভেবেছেন, তার জন্য কিছু করেছেন। সেটাই তাকে আলাদাভাবে বিশেষ অনুভব করাবে”- বলেন ডা. দিনা।
একটা দিন রান্নাঘর থেকে ছুটি দিন
মা প্রতিদিন রান্না করেন। সবার পছন্দ মনে রাখেন। কে কতটুকু ঝাল খায়, কার মিষ্টি বেশি লাগে — সব মাথায় থাকে। কিন্তু মায়ের নিজের পছন্দের কথা কজন মনে রাখি?
“এই মা দিবসে মায়ের পছন্দের খাবারটা নিজেই তৈরি করা যেতে পারে। ‘পারফেক্ট’ না হলেও ক্ষতি নেই। মা সেই রান্নার স্বাদ নয়, রান্নার পেছনের ভালোবাসাটুকুই খাবেন”- মন্তব্য করেন এই মনোবিদ।
যদি রান্না না-ই পারেন, অন্তত সকালে এক কাপ চা বানিয়ে মায়ের হাতে দেওয়া যেতে পারে।
ঘরের কাজে হাত লাগান
মায়েরা প্রায়ই নিজের বিশ্রামের কথা ভাবেন না। বরং সবাই বিশ্রাম নিলে তখনই তিনি কাজে হাত দেন। এটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে এতটাই যে তিনি, সেটা নিজেও বুঝতে পারেন না।
ডা. দিনার কথায়, “এই একটা দিন ঘরের কিছু দায়িত্ব নিজে নিন। ঘর গুছিয়ে দিন, বাসন ধুয়ে দিন, বাজার করে আনুন। ছোট ছোট এই কাজগুলোতে মা বুঝতে পারবেন, তার কষ্টটা আপনি দেখতে পাচ্ছেন, অনুভব করছেন। এই বোঝাপড়াটাই তার মনকে হালকা করে দেয়।”
‘ধন্যবাদ’ — কথাটা বলুন সরাসরি
আমরা ধরেই নিই মা আছেন, মা থাকবেন। তাই তাকে আলাদা করে ধন্যবাদ বলার কথা মাথায় আসে না।
তবে একবার ভাবুন, মা কতবার রাত জেগেছেন, কতবার নিজের ইচ্ছে চেপে রেখেছেন, কতবার চোখের জল লুকিয়েছেন, শুধু আপনার মুখে হাসি দেখবেন বলে। এই ত্যাগের জন্য কৃতজ্ঞতাটুকু জানানো কি খুব কঠিন?
“আজই বলুন। সরাসরি। চোখে চোখ রেখে। মা, তুমি যা করেছ আমার জন্য, সেটার কোনো তুলনা নেই। ধন্যবাদ। এটুকুতেই মায়ের চোখ ভিজে যাবে। কারণ এই কথাটার জন্য হয়ত তিনি অনেক দিন ধরেই অপেক্ষায় ছিলেন” বলেন ডা. দিনা।
শুধু ফেইসবুকের পোস্ট নয়, পাশেও থাকুন
মা দিবস এলেই অনেকে মায়ের ছবি পোস্ট করেন, ক্যাপশনে লেখেন সুন্দর সুন্দর কথা। লাইক আসে, কমেন্ট আসে।
তবে মা সেই পোস্ট দেখে কতটা খুশি হন, আর সন্তান পাশে বসে গল্প করলে কতটা খুশি হন— দুটো কখনও এক নয়।
“ভালোবাসাটা অনলাইনে নয়, বাস্তবে প্রকাশ করুন। মায়ের হাতটা ধরুন। কাছে বসুন। পোস্ট পরেও করা যাবে” পরামর্শ দিলেন ডা. দিনা।
মা দিবসের আসল সৌন্দর্য কোনো উপহারের মোড়কে নেই। সেটা লুকিয়ে আছে সেই মুহূর্তগুলোতে, যখন মা বুঝতে পারেন — তার সন্তান তাকে সত্যিই দেখছে, সত্যিই মনে রাখছে। এই বছর সেই মুহূর্তটা তৈরি করতেই পারেন।