মে ১১, ২০২৬ ১১:১৭ am
মা দিবস এলেই সামাজিক মাধ্যমে ভেসে ওঠে মায়েদের প্রতি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা আর শ্রদ্ধার নানা প্রকাশ। তবে এই উদযাপনের পেছনেও অনেক মা প্রতিদিন থাকেন এক অদৃশ্য চাপে।
সে চাপ হল, ‘ভালো মা’ হওয়ার চাপ।
সন্তান কী খাচ্ছে, কতক্ষণ মোবাইল দেখছে, মা চাকরি করছেন কি-না, নিজের জন্য সময় নিচ্ছেন কি-না- সবকিছু নিয়েই সমাজের এক ধরনের বিচার যেন চলতেই থাকে।
এ সময়ে মা হওয়া শুধু সন্তান বড় করার দায়িত্ব নয়, বরং প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রমাণ করার এক ক্লান্তিকর মানসিক লড়াইও।
অনেক মায়েরই মনে হয়, তারা যা-ই করেন না কেন, কোথাও না কোথাও যেন কম পড়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের ওয়েবসাইট ‘দ্য কাট’-এর জ্যেষ্ঠ লেখক ইজে ডিকসন তার বই ‘ওয়ান ব্যাড মাদার’-এ এই সামাজিক বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছেন।
তিনি সিএনএন ডটকম’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “খারাপ মা’ শব্দটি এত বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করা হয় যে, প্রায় যে কোনো মাকেই এর মধ্যে ফেলে দেওয়া সম্ভব।”
‘ভালো মা’ হওয়ার অদৃশ্য মানদণ্ড
সমাজে একজন মাকে কীভাবে দেখা হবে, তার নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। বরং বিপরীতধর্মী প্রত্যাশাগুলোই একসঙ্গে চাপিয়ে দেওয়া হয়।
ইজে ডিকসনের মতে, “মা যদি সন্তানকে বেশি স্বাধীনতা দেন, তবুও তাকে দোষ দেওয়া হয়। আবার বেশি নিয়ন্ত্রণ করলেও সমালোচনা শুনতে হয়। তিনি যদি নিজের চেহারা বা পোশাকের প্রতি মনোযোগ দেন, তাও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। আবার নিজেকে অবহেলা করলেও সমাজের মন্তব্য থামে না।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেভাবে চাপ বাড়াচ্ছে
আগে পরিবার বা আশপাশের মানুষ বিচার করলেও এখন সেই জায়গা আরও বড় হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে মায়েদের জীবন এখন যেন সবার দেখার জন্য খোলা।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফেয়ারলি ডিকিনসন’ বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগবিদ্যার অধ্যাপক কারা আলাইমো বলেন, “বর্তমান সময়ের পরিবেশে সবাই সবাইকে দেখছে এবং বিচার করছে।”
ইজে ডিকসনও মনে করেন- ইন্টারনেট এই চাপকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, “এখন অনেক মা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সামান্য বিশৃঙ্খল ঘর দেখালেও সমালোচনার মুখে পড়েন। কেউ যদি সন্তানের নাশতায় সহজ কোনো খাবার দেন, সেটিও সমালোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
তার মতে, “এমনকি যারা নিখুঁত মাতৃত্বের ছবি তুলে ধরেন, তারাও ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কঠোর মন্তব্যের শিকার হন।”
বাবাদের ক্ষেত্রে কেন একই বিচার নেই
সমাজে মায়েদের সঙ্গে বাবাদের আচরণের পার্থক্য এখনও স্পষ্ট।
ইজে ডিকসন বলেন, “বহু আগ থেকেই সন্তান পালনের প্রায় পুরো দায়িত্বই মায়ের ওপর চাপানো হয়েছে। সন্তানের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার দায়ও মাকেই বহন করতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে বাবাদের কাছ থেকে দীর্ঘ সময় খুব কম প্রত্যাশাই রাখা হয়েছে।”
তার মতে, “বর্তমানে অনেক বাবা সন্তান পালনে আগের চেয়ে বেশি যুক্ত হলেও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তেমন বদলায়নি।”
এখনও অনেক ক্ষেত্রে বাবারা শুধু উপস্থিত থাকলেই প্রশংসা পান, কিন্তু মায়েদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত বিচার করা হয়।
অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক মাতৃত্বের চাপ
বর্তমানে সন্তান পালনে ‘নিখুঁত’ হওয়ার চাপও বেড়েছে। কোন খাবার দেওয়া হবে, কতক্ষণ পড়াশোনা করবে, কার সঙ্গে মিশবে, কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করবে সবকিছু নিয়ে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণকে অনেকেই আদর্শ মাতৃত্ব হিসেবে দেখেন।
ইজে ডিকসনের মতে, “এই প্রবণতা শিশুদের জন্যও সবসময় ভালো নয়। কারণ শিশুরা নিজেদের ভুল থেকে শেখার সুযোগ হারায়।”
তিনি মনে করেন, এই ধরনের অতিরিক্ত চাপ মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বড় প্রভাব ফেলে। বর্তমানে উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় ভোগা মায়ের সংখ্যা বাড়ার পেছনে এই অসম্ভব মানদণ্ডের বড় প্রভাব আছে।
কাজ করা মায়েদের অপরাধবোধ
অনেক কর্মজীবী মা এখনও মনে করেন, সন্তানকে সময় দিতে না পারার জন্য হয়ত তারা ব্যর্থ হচ্ছেন। কাজের জায়গা আর পরিবার দুই দিক সামলাতে গিয়ে তারা ভেতরে ভেতরে অপরাধবোধে ভোগেন।
ইজে ডিকসন বলেন, “মানবসভ্যতার বেশিরভাগ সময়জুড়েই নারীরা ঘরের বাইরেও কাজ করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নারীদের ঘরে ফিরিয়ে আনার সামাজিক চাপ থেকেই ‘আদর্শ মা মানেই ঘরে থাকা মা’ ধারণাটি শক্তিশালী হয়।
সন্তান পালনের আসল মানে কী?
বর্তমানে অনেকেই একজন মায়ের সফলতা বিচার করেন সন্তানের ফলাফল, চাকরি বা সামাজিক অবস্থান দিয়ে। কিন্তু ইজে ডিকসন এই মানদণ্ডকে ভুল মনে করেন।
তার কথায়, “সন্তান পালনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ভালোবাসা, সহায়তা আর নিরাপত্তা দেওয়া। শিশু বড় হয়ে কী পেশায় যাবে বা কতটা সফল হবে, সেটিই একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না।”
মায়েদেরও বিশ্রাম প্রয়োজন
সমাজে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে একজন ‘ভালো মা’ সবসময় সন্তানকে সময় দেবেন, সবকিছু নিখুঁতভাবে সামলাবেন এবং কখনও ক্লান্ত হবেন না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
একজন মানুষের মতো মায়েরও বিশ্রাম, একান্ত সময় এবং মানসিক স্বস্তি প্রয়োজন।
মা দিবসের বার্তা হোক চাপ কমানোর
মা দিবস শুধু ফুল বা শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়, এটি মায়েদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ারও দিন। প্রতিটি মা একইভাবে সন্তান বড় করবেন না, একই সিদ্ধান্ত নেবেন না এটাই স্বাভাবিক।
তাই একজন মাকে ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ এই দুই ভাগে ফেলার বদলে তার পরিশ্রম, ক্লান্তি ও মানসিক চাপ বোঝার চেষ্টা করাই বেশি জরুরি।