মে ১১, ২০২৬ ১১:১১ am
ক্যাম্পাসের দখলদারি রাজনীতির বিরুদ্ধে নতুন করে সরব হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।
দখলদারির বিরোধিতায় নেমে একে অপরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগও তুলছেন তারা, যার প্রসঙ্গ ধরে উঠছে ‘গুপ্ত রাজনীতির’ আলোচনাও।
তবে দখলদারির বিরুদ্ধে সংগঠন দুটির সরব হওয়া কিংবা পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তোলার বিষয়টিকে ‘দখলের অভিপ্রায়’ হিসেবেই দেখছেন কোনো কোনো ছাত্রনেতা।
শিক্ষার্থীদের কোনো স্বার্থ ‘তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়’, এমন মন্তব্যও এসেছে কারো কারো কাছ থেকে।
আর শিক্ষার্থীদের বক্তব্য হল, ক্যাম্পাস কিংবা হলে এখনো ‘তেমন সমস্যা হয়নি’, তবে এই পরিবেশ ধরে রাখতে ছাত্রসংগঠনগুলোর ‘সহনশীল’ থাকাটা প্রয়োজন।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটলে সেই হাওয়া লাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতেও; ক্যাম্পাসে দেড় দশকের আধিপত্য হারায় ছাত্রলীগ। অন্যদিকে দৃশ্যমান হতে থাকে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মতো কোনাঠাসা হয়ে থাকা ছাত্র সংগঠনগুলোর কার্যক্রম।
তাদের সক্রিয় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আলোচনায় আসে দখলদারত্বের প্রসঙ্গও। দখলদারি দূর করার উপায় হিসেবে ৫ অগাস্টের পরেই দাবি ওঠে, ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা হোক, যে দাবি এখনও অব্যাহত আছে।
দাবির মুখে গত বছরের অগাস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের ঘোষণা আসে তৎকালীন উপাচার্য নিয়াজ আহমদের কাছ থেকে। কিন্তু ঘোষণার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে দাপ্তরিক কোনো নথি বা ঘোষণা আসেনি।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিতে আন্দোলন হলেও এর নেতৃত্বে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা আছেন বলে অভিযোগ ছাত্রদলের।
ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে শনিবার রাতে বিক্ষোভে নামেন ইডেন মহিলা কলেজের একদল শিক্ষার্থী।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচি চালানোর সুযোগ ছিল না।
কিন্তু ওই সময়ও ক্ষমতাসীন দলের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংগঠনে সক্রিয় থেকে শিবিরকর্মীরা যে গোপনে নিজেদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন, সেই সত্য সামনে আসতে থাকে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে।
ছাত্রদলের বক্তব্য হলো, আওয়ামী লীগের শাসনামলের মতো ছাত্রশিবির এখনো ‘গুপ্ত রাজনীতি’ করে ক্যাম্পাসে আধিপত্য ধরে রাখতে চাইছে। আর এ কারণেই তারা ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি তুলেছে।
সম্প্রতি দখলদারত্ব নিয়ে যে আলোচনা উঠেছে, তা ওই ‘গুপ্ত রাজনীতির’ সূত্র ধরেই।
২২ এপ্রিল সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের দেয়ালে ‘গুপ্ত’ লেখার সময় বাধা পাওয়ার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ মিছিল করেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
সেদিন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা বাধা দেওয়ার জন্য দায়ী করেন হল সংসদের পাঠকক্ষ সম্পাদক তারেক রহমান শাকিবকে, যিনি হল সংসদে জয়ী হন ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে।
আগের দিন, ২১ এপ্রিল চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রশিবিরের গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখনের জায়গায় ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখার জেরে উত্তেজনা থেকে সংঘর্ষ বেধে যায়।
সিটি কলেজের সংঘর্ষ ও ‘গুপ্ত’ লেখা নিয়ে আলোচনা হয় জাতীয় সংসদ অধিবেশনেও। সিটি কলেজের ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ‘দেয়াল লিখন’ কর্মসূচি পালন করে ছাত্রদল, যেখানে ‘গুপ্ত রাজনীতির’ অভিযোগে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবিও ওঠে।
গেল মঙ্গলবার ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামকে স্মারকলিপি দিয়ে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরে ছাত্রদল।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, “বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হলগুলোতে ‘গেস্টরুম-গণরুমের’ মাধ্যমে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের উপর চালাত নির্যাতনের ‘স্টিম রোলার’।
“সাম্প্রতিককালে অনলাইনে ও অফলাইনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু সংখ্যক শিক্ষার্থী সেরকম শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনার সাথে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত থাকার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।”
অভিযুক্ত প্রত্যেকেই আওয়ামী শাসনামলে ছাত্রলীগে সম্পৃক্ত ছিলেন দাবি করে স্মারকলিপিতে বলা হয়, তারা “চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর নিজেদের খোলস পালটে ছাত্রশিবিরে যুক্ত হয়েছেন।
“এদের মধ্যে অনেকে বর্তমানে ছাত্রশিবিরের গুপ্ত অপরাজনীতির মাধ্যমে সেই একই কায়দায় দখলদারত্বের রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় রত।”
ক্যাম্পাসে ‘ছাত্রশিবিরের দখলদারত্ব’ বন্ধ করাসহ নানা দাবিতে মঙ্গলবার উপাচার্যকে স্মারকলিপি দেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
‘গুপ্ত রাজনীতি’ নিয়ে একদিকে যখন ছাত্রদল সরব হয়ে উঠছে, তখন ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিও নতুন করে চাঙ্গা হচ্ছে।
সবশেষ শনিবার রাতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজে বিক্ষোভ করেন একদল শিক্ষার্থী। কলেজের প্রধান গেটের তালা ভেঙে বিক্ষোভে নামেন তারা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ছড়িয়ে পরা কয়েকটি ভিডিওতে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের একাংশকে ছাত্রদলের ব্যানার ফেস্টুন ছিঁড়ে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়।
ইডেনের ঘটনার চার দিন আগে গত মঙ্গলবার একই দাবিতে বিক্ষোভে নামেন ঢাকার তিতুমীর কলেজের একদল শিক্ষার্থী। তারা রাত ১০টার দিকে সুফিয়া কামাল ছাত্রীনিবাসের প্রধান ফটকের তালা ভেঙে বিক্ষোভে নামেন।
বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের যে আন্দোলন, তাতে জামায়াতের অধীনস্থ সংগঠন ইসলামি ছাত্রীসংস্থার যোগ দেখছে ছাত্রদল।
শনিবার রাতে ফেইসবুকে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির লেখেন, “কিছুদিন আগে তিতুমীর কলেজে রাতের বেলা গেট ভেঙে মব সৃষ্টি করেছিল ছাত্রীসংস্থার কর্মীরা। তারা ছাত্রদলের নেত্রীদের হেনস্তা করেছে।
“ওই ক্যাম্পাসে পাঁচ অগাস্টের পরে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন করা মুনতাসীর পরবর্তীতে কলেজ শাখা শিবিরের সেক্রেটারি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ইবলিসও লজ্জা পাবে এই সাধারণ শিক্ষার্থী বেশধারী গুপ্ত শিবিরকে দেখলে।”
এরপর নাছির লেখেন, “আজ একইভাবে ছাত্রীসংস্থার গুপ্ত কর্মীদের ইন্ধনে ইডেন কলেজে মব সৃষ্টি করে ছাত্রদলের নেত্রীদের এবং অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের হেনস্তা করা হচ্ছে। ছাত্রীদের হল থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে।
“গুপ্ত বাহিনী অবিলম্বে এই মব সন্ত্রাস ও ছাত্রদলের নেত্রীদের হয়রানি করা বন্ধ না করলে আমরা সব ধরনের মবসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলব।”
তবে ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে চলমান বিক্ষোভকে ‘ভীতসন্ত্রস্ত শিক্ষার্থীদের’ আন্দোলন হিসেবে দেখছেন ছাত্রশিবিরের নেতারা।
নাছিরের পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় ফেইসবুকে কয়েকটি ‘পত্রিকার কাটিং’ জুড়ে দিয়ে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ লেখেন, “ছাত্রদলের পুরোনো এই আমলনামা ইডেনের শিক্ষার্থীদের কাছে নিশ্চয়ই জানা আছে।
“জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ছাত্রদল নিজেদেরকে সংশোধন না করে বরং ঠিক তাদের পুরোনো পন্থায় রাজনীতি করে আবারও দেশের নানা জায়গায় সাংগঠনিক স্ট্রাকচার তৈরি করে চাঁদাবাজি করেছে, খুন-ধর্ষণসহ সকল প্রকার অপরাধে জড়িয়ে পুরো ছাত্ররাজনীতিকে কলুষিত করেছে। ফলে ভীতসন্ত্রস্ত শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে রাজনীতির বিরুদ্ধে স্লোগান তুলছে।”
ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে মঙ্গলবার রাতে বিক্ষোভে নামেন সরকারি তিতুমীর কলেজের একদল শিক্ষার্থী।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনকে ‘সহযোগিতা’ করতে হলগুলোতে ‘ব্যাচ প্রতিনিধি’ নির্বাচন করা হয়।
সে সময় থেকে ডাকসু নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এসব ব্যাচ প্রতিনিধি হলগুলোর খাবার মান রক্ষা, আসন বণ্টনের তদারকিসহ নানা বিষয়ে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে একাধিক প্রাধ্যক্ষ জানিয়েছেন।
পরে দেখা যায়, অনেক ব্যাচ প্রতিনিধি ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের সমর্থন পেয়ে গেছেন। ছাত্রদের ১৩টি আবাসিক হলে এরকম অন্তত ১৩ জন ব্যাচ প্রতিনিধি পাওয়া গেছে।
এ তালিকায় আছেন সূর্যসেন হলের ভিপি আজিজুল হক, জিএস মোখলেছুর রহমান জাবির ও এজিএস মো. রিয়াজউদ্দীন সাকিব।
মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে উত্তর ব্লক ও দক্ষিণ ব্লক থেকে দুজন ‘ব্যাচ প্রতিনিধি’ নির্বাচন করা হয়। এর মধ্যে জিএস পদে শিবিরের সমর্থন নিয়ে বিজয়ী হন উত্তর ব্লকের ব্যাচ প্রতিনিধি আসিফ ইমাম।
কবি জসীম উদ্দীন হলে জিএস পদে শিবিরের সমর্থনে নির্বাচিত হওয়া মাসুম আবদুল্লাহ হলটিতে গঠিত নিরাপত্তা কমিটিতে কাজ করতেন। এছাড়া এই হলের নিরাপত্তা কমিটির সদস্য মাজহারুল ইসলাম শিবিরসমর্থিত প্যানেল থেকে ডাকসুর ক্যারিয়ার উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন।
একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলে ভিপি পদে রফিকুল ইসলাম জয়ী হন, যিনি ৫ অগাস্টের পর ওই হলের সংস্কার কমিটির উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন ।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ‘ব্যাচ প্রতিনিধি’র তালিকায় প্রতি শিক্ষাবর্ষ থেকে ৫ জন করে মোট ২৪ জনের নাম রয়েছে। এ হলে জিএস পদে জয়ী হওয়া খালেদ হোসেনও ছিলেন সেই তালিকায়। তিনি বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের সঙ্গে জড়িত।
ডাকসুর শীর্ষ তিন পদে বিজয়ী শিবিরের সাদিক কায়েম, এসএম ফরহাদ ও মহিউদ্দীন খান।
বিজয় একাত্তর হলে এজিএস পদে শিবিরের সমর্থনে নির্বাচিত হন ইমরান হোসাইন। তিনিও হলের ‘ব্যাচ প্রতিনিধি’ ছিলেন।
শেখ মুজিবুর রহমান হলে শিবির সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে জিএস পদে নির্বাচিত হন আহমেদ আল সাবাহ। ব্যাচ প্রতিনিধির দায়িত্বে ছিলেন তিনিও।
ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হল ভিপি পদে তারেকুল ইসলাম তারেক ও এজিএস পদে ইব্রাহিম খলিল শিবিরের সমর্থনে নির্বাচিত হন। এর মধ্যে তারেক ১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ও এজিএস ইব্রাহিম খলিল ২০-২১ শিক্ষাবর্ষের প্রতিনিধি হিসেবে হলে অভ্যুত্থানের পর কাজ করেন।
ফজলুল হক মুসলিম হলে শিবিরের সমর্থনে ভিপি পদে নির্বাচিত খন্দকার মো. আবু নাঈম হলটির ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের প্রতিনিধি ছিলেন।
এমনকি যেসব ছাত্র প্রতিনিধি ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ চেয়েছিলেন, তাদের অনেককে পরে ছাত্রশিবির প্যানেল থেকে নির্বাচন করে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে দেখা গেছে।
ছাত্রদল বলছে, ‘ব্যাচ প্রতিনিধির’ নামে ছাত্রশিবির মূলত হলগুলো দখলে রাখার চেষ্টা করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “৫ অগাস্টের পর ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ছাত্রলীগের খোলস ছেড়ে ছাত্র প্রতিনিধির নামে হলগুলো এককভাবে দখল করেছে। সাধারণ ছাত্র পরিচয় দিয়ে ছাত্ররাজনীতি থাকবে না বলে মব করেছে।
“পরে এই সাধারণ ছাত্র বেশ ধরা এসব শিক্ষার্থীকে আমরা দেখলাম, ডাকসু নির্বাচনে শিবিরের সঙ্গে যুক্ত হতে।”
ছাত্রদলের এই নেতার অভিযোগ, “ছাত্রশিবিরের এসব নেতাকর্মী ৫ অগাস্টের পর থেকে ভিন্নমত দমন করেছে। তারা ভিন্নমতের কোনো সংগঠনের সদস্যদের হলে পর্যন্ত উঠতে দেয়নি।”
এদিকে ‘গুপ্ত’ রাজনীতির বিরুদ্ধে ছাত্রদলের আন্দোলনকে ‘দখলদারত্বের চেষ্টা’ হিসেবে দেখছে ছাত্রশিবির। ছাত্রদলের তোলা অভিযোগ অস্বীকারও করেছে সংগঠনটি।
ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মুহা মহিউদ্দিন খান বলেন, “ছাত্রদের হলে আসন দেওয়া না-দেওয়ার কাজ তো ছাত্র প্রতিনিধিদের নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আসন দিয়েছে। তবে কারো বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আমরাও সে বিষয়েও কথা বলব।”
তিনি বলেন, “ছাত্রদল নির্বাচনের পর থেকে বিভিন্ন জায়গায় হল দখলের মনোভাব দেখিয়েছে। তারা মিথ্যাচারের মাধ্যমে ছাত্রশিবিরের ওপর দায় চাপাতে চাইছে, যেন ছাত্রলীগ পুনর্বাসনের দায় এড়াতে পারে।”
অন্যরা কী বলছেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ক্যাম্পাসগুলোতে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠনের উপস্থিতি বেশি দেখা গেছে।”
অন্তর্বর্তী সরকার একটা সংগঠনের প্রতি ‘হেলে ছিল’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সরকার চাইলে একটা ভারসাম্য রাখতে পারত, কিন্তু সেটা করেনি। ফলে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে সে ক্ষমতা কাঠামোয় পরিবর্তন আসে।”
নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রাশেদা রওনক খানের ভাষায়, গত দেড় বছর ক্যাম্পাসে মব কালচার রাজনৈতিক পরিবেশকে অনেকটাই অসহিষ্ণু করে তুলেছে।
ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক পরিবেশকে ‘সহনশীল’ রাখা এবং ‘শিক্ষাবান্ধব’ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টিকে তিনি বর্তমান প্রশাসনের জন্য ‘বড় চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে দেখছেন।
রাশেদা রওনক খান বলেন, “ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট নিরসন করা যেতে পারে। আর এটি করতে পারলেই ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।”
বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক জাবির আহমদ জুবেল মনে করেন, ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে যে বিরোধ, ‘তা মূলত হল দখলের জন্য’।
তিনি বলেন, “দুই পক্ষেরই উদ্দেশ্য ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করা। তাদের কাছে শিক্ষার্থীদের অধিকার, সমস্যা, শিক্ষার মান ইত্যাদি কোনো ইস্যু নয়।
“তাই এখন থেকে শিক্ষার্থীরা যদি তাদের প্রতিরোধ না করে, তাহলে তাদের হল দখল ও ক্যাম্পাস দখল আরও ভয়ংকর আকার ধারণ করবে।”
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, “ক্যাম্পাস ছাত্রদলের দখলে থাকবে, নাকি ছাত্রশিবিরের, সেটা নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে।
“এই দ্বন্দ্বে পড়ে শিক্ষাঙ্গনের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকছে, সাধারণ ছাত্ররা আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকি যেসকল ছাত্র ছাত্রদল বা ছাত্রশিবির, কোনো সংগঠনই করেন না, তারা পর্যন্ত আক্রান্ত হচ্ছেন।
“এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট, তাদের এ দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সঙ্গে ছাত্রদের স্বার্থের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই, শিক্ষার কোনো দাবি নেই। এগুলো স্রেফ ক্যাম্পাস দখলে রাখার চেষ্টা।”
গত বছরের ৯ অগাস্ট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন তৎকালীন উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খান।
কার নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পাস
শিবির ও ছাত্রদলের দখলদারত্বের বিরোধে শিক্ষার পরিবেশে যেন বিঘ্ন না ঘটে, সেই প্রত্যাশার কথা শুনিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
বিজয় একাত্তর হলের আবাসিক শিক্ষার্থী সাইদ সরকার বলেন, “হলগুলোতে এখন পর্যন্ত তেমন সমস্যা হয়নি। তবে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে কোন্দল আছে। তবে এখনো হাতাহাতির পর্যায়ে যায়নি। এক্ষেত্রে দুই পক্ষই যদি সহনশীল আচরণ করে, তাহলে ছাত্ররা ভালো থাকবে।”
ক্যাম্পাস ও আবাসিক হলের ছাত্ররাজনীতিতে বর্তমানে কোনো সংগঠনের একচ্ছত্র আধিপত্য নেই। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির—উভয় সংগঠনের নেতাকর্মীরা সক্রিয় রয়েছেন।
তবে ছাত্র সংসদ ও হল সংসদের জায়গা থেকে দেখলে ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের আধিপত্য রয়েছে।
এবার ডাকসুতে অভাবনীয় জয় পায় জুলাই অভ্যুত্থানের সুযোগে নতুন চেহারায় আবির্ভূত হওয়া ছাত্রশিবির। অতীতে কখনও ডাকসুর পদে না পাওয়া সংগঠনটি ভিপি ও জিএসসহ ১২টি সম্পাদকীয় পদের মধ্যে নয়টি জিতে নেয়। হল সংসদেও একচ্ছত্র জয় পায় ছাত্রশিবিরের সমর্থন পাওয়া প্রার্থীরা।
এই জয়ের একটা প্রভাব হলগুলোতে রয়েছে বলে মনে করেন কোনো কোনো শিক্ষার্থী।
হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের শিক্ষার্থী ইসমাইল বলেন, “হলগুলো এখন পর্যন্ত শিবির একক কর্তৃত্ব নিয়ে চালাচ্ছে। যেহেতু তারা ছাত্র সংসদে নির্বাচিত হয়েছে, তারাই এখন সব নিয়ন্ত্রণ করে।
“তবে সামনে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে কাজ নিয়ে সমস্যা হতে পারে। আমরা কারো দখলদারত্ব চাই না। সবাই রাজনীতি করুক। তবে শিক্ষার্থীদের যেন সমস্যা না হয়, সেটা মাথায় রাখতে হবে।”
জিয়াউর রহমান হলের শিক্ষার্থী আলফাজ রহমান বলেন, “হলগুলোতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আছেন। তারা তো সমস্যা করে না। রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত হলে এখানে ছাত্রদের কোনো সমস্যা হবে না। তবে ছাত্রশিবির এখন হল সংসদের নামে পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করছে।”