মে ১০, ২০২৬ ১২:৩৯ pm
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১৯ হাজার ১০৪ কোটি টাকার পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। গত বছরের একই সময়ে এটি ছিল ৯ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পারস্পরিক শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার পর চুক্তিটির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এমনকি মালয়েশিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা একই ধরনের একটি চুক্তি গত ১৬ মার্চ বাতিল ঘোষণা করেছে।
এআরটি চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ৪ হাজার ৫০০টি মার্কিন পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নিতে রাজি হয়েছে। এ ছাড়া আরো ২ হাজার ২১০টি পণ্যের শুল্ক পর্যায়ক্রমে কমানো হবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ফাইবার, লোহা, ইস্পাত, ওষুধ, রাসায়নিক ও মার্কিন তুলা থেকে তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যের ওপর আরোপিত প্রতিশোধমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করেছে। তবে গড়ে ১৬-১৭ শতাংশ মোস্ট-ফেভারড-নেশন (এমএফএন) শুল্ক এখনো বহাল রয়েছে।
ইউএসটিআর বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক আরো এক শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এর আগে গত বছরের এপ্রিলে বাণিজ্য ঘাটতির অজুহাতে বাংলাদেশ থেকে আমদানির ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
যদিও চুক্তির আইনি প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু সরকার এর মধ্যেই আমদানি শুরু করে দিয়েছে। যেমন গত মাসেই বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বড় একটি চুক্তি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
অধ্যাপক মইনুল বলেন, এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে তাতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রাপ্তি সীমিত, বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র অনেক বেশি লাভবান হতে যাচ্ছে। শুল্ক কমানোর পাশাপাশি এই চুক্তিতে কৃষি পণ্য, জ্বালানি ও শিল্প কাঁচামালের ন্যূনতম বার্ষিক আমদানির প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর ফলে দেশীয় চাহিদা কম থাকলেও বা দাম বেশি হলেও বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য আমদানি করতে হতে পারে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কম অগ্রাধিকার পেয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির ৮৩ শতাংশই ছিল ১০টি নির্দিষ্ট পণ্য, যার মূল্য ১৫ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। এগুলো হলো এলএনজি, এলপিজি, সয়াবিন, গম, তুলা, লোহা ও ইস্পাত স্ক্র্যাপ, সয়াবিন অয়েলকেক ও মিল, উড়োজাহাজের ইঞ্জিন, ব্রিউয়িং ওয়েস্ট ও তরল প্রোপেন। তালিকার শীর্ষে রয়েছে এলএনজি (৪ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা), যা আমদানি করেছে পেট্রোবাংলা। এর পরেই রয়েছে এলপিজি (৩ হাজার ১০৫ কোটি টাকা), যার প্রধান আমদানিকারক ছিল ওমেরা পেট্রোলিয়াম (৬৮৪ কোটি টাকা), সান গ্যাস (৫০৭ কোটি টাকা) এবং ইউনাইটেড আয়গাজ এলপিজি (৪৪২ কোটি টাকা)। গত বছরের এই সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো এলএনজি বা এলপিজি আমদানি করেনি।
এ ছাড়া এই চার মাসে ১ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকার আমেরিকান গম আমদানি করা হয়েছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো গম কেনা হয়নি। এর মধ্যে খাদ্য অধিদপ্তরই ১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকার গম আমদানি করেছে।
তৈরি পোশাক খাতের জন্য অপরিহার্য মার্কিন তুলার আমদানি গত বছরের তুলনায় ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
এ ছাড়া উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা ১৩৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
তবে কিছু প্রধান পণ্যের আমদানি কমেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন তেলের আমদানি ৩ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা থেকে কমে ৩ হাজার ২৪০ কোটি টাকায় এবং লোহা ও ইস্পাত স্ক্র্যাপের আমদানি ১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা থেকে কমে ৭০৪ কোটি টাকায় নেমেছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৬ কোটি টাকার সয়াবিন ও সয়াবিন বীজ আমদানি করেছে সোনারগাঁও সিডস ক্রাশিং মিলস। ডেল্টা অ্যাগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজের আমদানির পরিমাণ ছিল ৮৬৭ কোটি টাকা এবং যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চারের ৮১১ কোটি টাকা।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ও সিইও এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র উচ্চ শুল্ককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে দেশগুলোকে এমন বাণিজ্যচুক্তিতে বাধ্য করেছে, যাতে তাদের নিজেদের রপ্তানি বাড়ানো যায়। বাংলাদেশ যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বড় রপ্তানিকারক, তাই তাদের শর্ত মানতে হচ্ছে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই আমদানি বেড়েছে।
আমদানি করা পণ্যগুলোর অধিকাংশই ছিল জ্বালানি, গম, সয়াবিন ও উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। আগে এসব পণ্য অন্য দেশ থেকে আনা হতো, এখন সেগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হচ্ছে। ফলে চুক্তিটির প্রভাব আমদানিতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।