শনিবার, মে ৩০, ২০২৬

ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে কী জানা যায়?

মে ৭, ২০২৬ ১২:৩৯ pm

বহু দশক ধরে কয়েকজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা, ইসরায়েলি তথ্য ফাঁসকারী এবং প্রকাশ্যে আসা মার্কিন গোয়েন্দা নথিতে ইসরায়েলের কথিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তথ্য উঠে এসেছে।

নথি অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালে সিআইএ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসনকে জানিয়েছিল, ইসরায়েল তখনই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে বা তা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে।

পরে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছান। সেই চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বা তদারকি বন্ধের বিনিময়ে ইসরায়েল তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্ব স্বীকার না করা এবং পরীক্ষা না করার নীতি গ্রহণ করে।

ইসরায়েলি পারমাণবিক প্রযুক্তিবিদ থেকে তথ্য ফাঁসকারী হয়ে ওঠা মোরদেচাই ভানুনু ১৯৬৮ সালের একটি যুগান্তকারী প্রতিবেদনে নেগেভ নিউক্লিয়ার রিসার্চ সেন্টারের প্রমাণ যুক্তরাজ্যের সানডে টাইমস-এর কাছে ফাঁস করেন। এটি ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার জন্ম দেয়।

রুবিওকে লেখা চিঠিতে মার্কিন আইনপ্রণেতারা বলেন, প্রকাশ্য নথি ও বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে ধারাবাহিকভাবে এই ধারণা শক্ত হয়েছে, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। তারা ১৯৭৪ সালের একটি মার্কিন বিশেষ গোয়েন্দা মূল্যায়ন এবং মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের একাধিক বিবৃতির কথাও উল্লেখ করেন।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব পদপ্রার্থী রবার্ট গেটস, যিনি ২০০৬ সালে সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ইসরায়েলকে বিশ্বের অন্যতম ‘পারমাণবিক অস্ত্রধারী শক্তি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিলেন।

নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের অনুমান অনুযায়ী, ইসরায়েলের কাছে ৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড, ৭৫০ থেকে এক হাজার ১১০ কেজি (১৭০০ থেকে ২৪০০ পাউন্ড) প্লুটোনিয়ামের মজুদ, পারমাণবিক অস্ত্র নিক্ষেপে সক্ষম ছয়টি সাবমেরিন এবং চার হাজার ৮০০ থেকে ছয় হাজার ৫০০ কিলোমিটার (৩০০০ থেকে ৪০০০ মাইল) পাল্লায় পৌঁছাতে সক্ষম মধ্যম-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের একদল ডেমোক্র্যাট সদস্য মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিনের নীরবতা ভাঙার আহ্বান জানিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাঠানো এক চিঠিতে তারা বলেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে এ বিষয়ে এখন পরিষ্কার অবস্থান নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

ধারণা করা হয়, ইসরায়েলের কাছে ১৯৬০-এর দশক থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র আছে। তবে দেশটি কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি বা অস্ত্রভাণ্ডারের অস্তিত্ব স্বীকার করেনি। হোয়াইট হাউসও বহু বছর ধরে এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেনি। যদিও মাঝে মধ্যে কিছু ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য এসেছে। এ অবস্থায় কংগ্রেসের কিছু সদস্য বহুদিন ধরেই এ বিষয়ে আরো স্বচ্ছতা দাবি করে আসছেন।

৩০ জন কংগ্রেস সদস্যের স্বাক্ষর করা চিঠিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক ভারসাম্য, সংঘাত আরো বাড়ার ঝুঁকি এবং এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে কংগ্রেসকে পুরোপুরি জানানো সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু তারা মনে করেন, এসব তথ্য তাদের দেওয়া হয়নি।

চিঠিতে আরো বলা হয়, সংঘাতে জড়িত কোনো একটি দেশের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে সরকারি অস্পষ্টতা থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে কার্যকর পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ নীতি গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ইরান, সৌদি আরবসহ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোও তাদের প্রতিবেশীদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকে।

ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের মতে, ধারণা করা হয়, ইসরায়েলের কাছে ১৯৬০-এর দশক থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। দেশটি পারমাণবিক অস্বচ্ছতার নীতি বজায় রেখেছে এবং তার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ও অস্ত্রাগারের অস্তিত্ব কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। হাতেগোনা কয়েকটি দায়সারা স্বীকারোক্তি সত্ত্বেও হোয়াইট হাউসও দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে অস্পষ্টতা বজায় রেখেছে।

বিভিন্ন আইনপ্রণেতা এর আগেও ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র বিষয়ে আরো স্বচ্ছতার আহ্বান জানিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিনিধি জেমস ম্যাকগভার্ন ২০১৯ সালের একটি প্রস্তাবে ইসরায়েলকে একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবুও মার্কিন রাষ্ট্রপতি প্রশাসনের ওপর কংগ্রেসের সম্মিলিত চাপ অত্যন্ত বিরল।

গাজায় গণহত্যা এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, উভয় দলের আইনপ্রণেতারা যখন ইসরায়েলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে ক্রমবর্ধমানভাবে প্রশ্ন তুলছেন, ঠিক তখনই এই চিঠিটি এসেছে। গত এপ্রিলে ৪০ জন ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ইসরায়েলের কাছে সামরিক বুলডোজার বিক্রি বন্ধ করার একটি বিলের সমর্থনে ভোট দেন। তবে বিলটি ব্যর্থ হয়।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা তাদের যুদ্ধের একটি প্রধান উদ্দেশ্য। তেহরান বহু বছর ধরে এই ধরনের অস্ত্র তৈরির চেষ্টার কথা অস্বীকার করে আসছে। আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে, ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং পলিসি প্রজেক্ট-এর নীতি পরিচালক জশ রুবনার, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে স্বচ্ছতার আহ্বান জানানোর জন্য আইনপ্রণেতাদের প্রশংসা করেছেন।

রুবনার বলেন, ‘এই উদ্যোগটি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসী যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নেওয়া হচ্ছে। এই যুদ্ধ শেষ করার জন্য ট্রাম্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য আলোচনা করা।’

তিনি আরো বলেন, ‘কংগ্রেসের সদস্যরা ঠিকই প্রশ্ন তুলেছেন, যখন আমরা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছি, তখন ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিষয়টি কেন ছাড় পেয়ে যাচ্ছে।’