মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৪, ২০২৬

ব্যবসা আগের মত নেই, হালখাতারও জৌলুস নেই’

এপ্রিল ১৩, ২০২৬ ১:৫০ pm

চৈত্রের শেষে ঝাঁঝালো রোদ আর উত্তপ্ত হাওয়া জানান দিচ্ছে নববর্ষের; বছরের প্রথম এ দিনে সাজসজ্জা আর নানা অনুষ্ঠানের পাশাপাশি হালখাতার আয়োজন ব্যবসায়ীদের পুরনো রেওয়াজ।

যদিও আগের মত নিমন্ত্রণপত্র দিয়ে অনুষ্ঠান করে লাল মলাটের হালখাতা খোলা কেবল নিয়ম রক্ষার আচার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্যবসায়ীরাও বলছেন, পহেলা বৈশাখে হালখাতা আয়োজনের ‘জৌলুস আর নেই’। অথচ এ দিনটি ঘিরেই একসময় তারা লম্বা প্রস্তুতি নিতেন। দোকানপাট ধুয়ে-মুছে লাল-নীল ফিতা, কাগজের ফুলে সাজাতেন। দোকানে মিলাদও দিতেন, সন্ধ্যার পর হত গান-বাজনার আসরও। সেইসঙ্গে গ্রাহকদের আপ্যায়ন করে বকেয়ার পুরনো খাতার হিসাব কেটে নতুন খাতা খুলতেন।

এবারের পহেলা বৈশাখে হালখাতার প্রস্তুতি জানতে চাইলে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমীর চন্দ্র খাঁ বলেন, “আগে যারা বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে আট আনা স্বর্ণ কিনত, এহন তারা দুই আনা কেনারও সাহস পায় না।”

সমীর চন্দ্রের ভাষ্য, “ব্যবসার অবস্থা আগের মতো নেই, তাই হালখাতারও জৌলুস নেই।”

নববর্ষের দিন পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার, শাঁখারী বাজার, শ্যামবাজার আর ইসলামপুরসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা হালখাতার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিতেন। চৈত্র মাসের শুরুতেই নিমন্ত্রণপত্র ছাপাতেন। গ্রাহকদের কাছে সেগুলো কয়েক দিন ধরে পৌঁছে দিতেন। এক মাসের বেশি সময় ধরে তারা ব্যাপক ব্যস্ত হয়ে পড়তেন।

তবে এখন সেই রীতিতে পরিবর্তন এসেছে। নিমন্ত্রণপত্রের বদলে মোবাইল ফোনে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হালখাতার দাওয়াতের কার্যক্রম সারেন অনেক ব্যবসায়ী। হালখাতা হলেও কেবল দোকান সাজানো আর আপ্যায়নের ব্যবস্থা থাকে।

আগের মতো আর কিছুই নেই’

পুরান ঢাকার দোকানিরা বলছেন, তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার ও ইসলামপুরে গয়না তৈরির দোকান প্রায় হাজারখানেক। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে হালখাতার জন্য দোকান সাজিয়ে নিচ্ছেন। গ্রাহকদের নিমন্ত্রণও করছেন। ‘ব্যবসায়িক কার্যক্রম ‘ভালো না চলার’ কথা জানিয়ে নিয়ম রক্ষার হালখাতা আয়োজনের কথা বলছেন।

পুরান ঢাকার রবীন জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী উত্তম দাস বলেন, “ছোটবেলা থেকেই পৈতৃক ব্যবসা হিসেবে স্বর্ণের দোকানে থাকি। এখন ব্যবসার বয়স প্রায় ৫০ বছর পেরিয়েছে। তবে আগের মতো আর কিছুই নেই।

“নিয়ম রক্ষা হিসেবে কাস্টমারদের নিমন্ত্রণ করব। তারা অনেকেই আর আগের মতো লেনদেন করতে আসেন না।”

উত্তম বলেন, “আমাদের পঞ্জিকা অনুসারে বৈশাখ হচ্ছে বুধবার। তার আগের দিন দোকান একটু সাজাব। কিছু কাস্টমারদের আসতে বলেছি। তাদের মিষ্টি মুখের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।”

ইউকি জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী সমীর চন্দ্র খাঁ বলেন, “আমার এই ব্যবসার বয়স ২০ বছরের বেশি। আগে বিয়ে-শাদি, মুখেভাতসহ নানা অনুষ্ঠানে মানুষ স্বর্ণ কিনত। কিন্তু এখন সেই অবস্থা নাই। কারণ আগের চেয়ে অনেক দাম বেড়েছে। ফলে আমাদের ব্যবসাও কমেছে।”

হালখাতার কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বৈশাখের প্রথম দিন হালখাতায় যে পরিমাণ লেনদেন হতো, তার চার ভাগের এক ভাগও এখন হয় না। তবে এই এলাকার ব্যবসার একটা ঐতিহ্য হালখাতা। এবারও সেটি আয়োজন করছি।”

হালখাতার সরঞ্জামের দোকানে বেড়েছে বিক্রি

নববর্ষ আসলেই হালখাতার সরঞ্জাম বিক্রির ধুম পড়ে। হালখাতা ঘিরে চৈত্রের শেষ সপ্তাহে কয়েক লাখ টাকার জিনিসপত্র বিক্রি হওয়ার কথা বলছেন দোকানিরা। ব্যবসায়ীদের চাহিদার সবার ওপরে থাকে লাল মলাটের টালি খাতা। আকার ও মান অনুযায়ী সেগুলোর দামও একেকরকম।

টালি খাতা বিক্রেতা ফরহাদ হোসেন বলেন, “প্রতি বছর নববর্ষের আগে টালি খাতাসহ হালখাতার সরঞ্জাম বিক্রি বেড়ে যায়। এক সপ্তাহে ২ থেকে ৩ লাখ টাকার মতো শুধু খাতা বিক্রি হয়।”

শাঁখারী বাজারের মা স্টেশনারির স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান বলেন, “সারা বছরই আমাদের ব্যবসা ভালোই চলে। তবে নববর্ষের আগে খাতা, রঙিন কাগজ, দোকান ঘর সাজানোর বিভিন্ন জিনিসের বিক্রি বেড়ে যায়।”

বাংলা নববর্ষ উদযাপনে হালখাতার প্রচলন হয় ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে; মোগল সম্রাট আকবরের বাংলা সন প্রবর্তনের পর। বাংলা নববর্ষে রাজার ভাণ্ডারে খাজনা প্রদানের দিনটি কালের বিবর্তনে ব্যবসায়ীদের মধ্যে হালখাতায় রূপ নেয়।

ফারসি শব্দ ‘হাল’ অর্থ নতুন। সে অর্থে পুরনো হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে নতুন খাতায় নাম লেখানোই হালখাতা।

লাল কাপড়ের মলাটে বাঁধাই করা সেই নতুন খাতাই ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যবসায়িক সম্পর্কের পরম্পরা হিসেবে থেকে যায়।