এপ্রিল ৯, ২০২৬ ১১:৩৭ am
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় আড়াইশ’র বেশি লোক নিহত হওয়ার পর পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী শান্তি চুক্তি করার আলোচনা এগিয়ে নেওয়া ‘অযৌক্তিক’ হবে।
মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পরও মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে তা ইরানের মূল আলোচক, পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফের দিক থেকে আসা এ সতর্কবার্তায় পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।
শনিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া শান্তি আলোচনার জন্য উভয় পক্ষই বিপরীতধর্মী অনেক এজেন্ডা সামনে এনেছে; দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ওই আলোচনা পর্যন্ত টিকে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ থাকছে, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
কালিবাফ বলেছেন, ইরানঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ’র ওপর হামলা অব্যাহত রেখে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির একাধিক শর্ত লঙ্ঘন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও ইরানকে তার পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা ত্যাগের চাপ দিয়ে চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
“এই পরিস্থিতিতে, দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি বা আলোচনা অযৌক্তিক,” বিবৃতিতে বলেছেন কালিবাফ।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই বলছে, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রতিবেশী দেশটিতে হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও।
“আমার মনে হয়, ইরানিরা মনে করেছিল যুদ্ধবিরতির মধ্যে লেবাননও আছে, আসলে নেই,” বুদাপেস্টে সাংবাদিকদের এ কথাই বলেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় তিনিই যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকদলের নেতৃত্ব দেবেন।
দুই পক্ষের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও অবস্থানেও ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে।
ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ বন্ধে রাজি হয়েছে। এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র বানানো সম্ভব। এদিকে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরান তাদের কাছে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ওয়াশিংটনের হাতে তুলে দেওয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছে।
“ইরানের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্র মাটি খুঁড়ে, মাটির অনেক নিচে চাপা থাকা পারমাণবিক ‘ধূলিকণা’ সরিয়ে নেবে,” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন ট্রাম্প।
অন্যদিকে কালিবাফ বলছেন, যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখতে পারবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতে নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করেছে। কিন্তু তাদের মধ্যকার মূল বিরোধগুলো এখনও অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। দুই পক্ষই এখন এমন সব দাবি সামনে আনছে, যা সামনের দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের গঠন বদলে দিতে পারে।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও শেয়ারবাজারগুলোতে সূচকের ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে, তেলের দাম ১৪% কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলারে স্থির হয়েছে। এর আগে এক পর্যায়ে এটি ৯০ দশমিক ৪০ ডলারে নেমেছিল।
বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেল এখনও মোটাদাগে যুদ্ধপূর্ববর্তী দামের তুলনায় ২৫ ডলার উপরে রয়েছে।
কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক বিনিয়োগ সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তেহরান যে উপসাগরের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে, এবারের যুদ্ধে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ইরান। সংঘাত যে উপসাগরীয় অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য ও সম্পর্কের ধরণ বদলে দিয়েছে, এখন তাও বোঝা যাচ্ছে।
নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘ট্রিগারে আঙুল রয়েছে’ ইসরায়েলের এবং তারা ‘যে কোনো মুহূর্তে’ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ফিরতে প্রস্তুত।
এদিকে লেবাননের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ বলছে, বুধবার তাদের বিভিন্ন শহরে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২৫৪ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে কেবল রাজধানী বৈরুতেই প্রাণ গেছে ৯১ জনের। হামলাপূর্ব সতর্কবার্তা দেওয়া ছাড়াই ইসরায়েল অনেক জায়গায় হামলা চালিয়েছে বলেও দাবি অনেক বেসামরিকের।
বৃহস্পতিবার ভোরের আগে হিজবুল্লাহও জানায়, ইসরায়েলের ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের’ প্রতিক্রিয়ায় তারা উত্তর ইসরায়েল লক্ষ্য করে রকেট ছুড়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ লেবাননে ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার কড়া নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, লেবাননকেও যুদ্ধবিরতিতে অন্তর্ভুক্ত করতেই হবে।
১৩টি ইউরোপীয় দেশ, জাপান ও কানাডার নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে এবং ‘মারাত্মক বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কট এড়াতে’ দ্রুত বৈরিতার অবসান ঘটানোর তাগাদা দিয়েছে।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পরও ইরান সৌদি আরবের তেলের পাইপলাইনসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে একাধিক হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ এসেছে।
সৌদি আরবের ওই তেলের পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালিকে পাশ কাটিয়ে জ্বালানি সরবরাহে ব্যবহৃত হত, বলেছে তেল খাত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি এখনও ছাড়পত্রবিহীন নৌযানের জন্য বন্ধ রয়েছে। নৌচলাচল শুরুর আগে আরও পরিষ্কার নির্দেশনা প্রয়োজন, বলছে জাহাজ পরিচালনাকারীরা।
নৌ-মাইন এড়িয়ে চলতে হরমুজে নৌচলাচলের বিকল্প রাস্তা দেখানো একটি ম্যাপ ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছে ইরানের আধাসরকারি বার্তা সংস্থা ইসনা।
এদিকে ট্রাম্প হুট করে অনলাইনে দেওয়া পোস্টে যে দেশ ইরানে অস্ত্র সরবরাহ করবে তাদের সব পণ্যে নতুন করে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও এমনভাবে শুল্ক বাড়ানোর এখতিয়ার তার নেই বলে জানিয়েছে রয়টার্স।